৫ মে, ১৯৮৬

১৯৮৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শেখ হাসিনার ভাষণ

প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৬

জাগরণীয়া ডেস্ক

আমার প্রিয় দেশবাসী

আসসালামু আলাইকুম

আপনারা প্রথমেই আমার সংগ্রামী সালাম ও অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আপনারা জানেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আপনাদের প্রিয়নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে জনগণের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে এদেশে সূচিত হয়েছে সামরিক শাসনের ধারা। বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে আপনাদের অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশলক্ষ মানুষের আত্মদান, কোটি কোটি দেশবাসীর অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা, আড়াই লক্ষ মা-বোনের লাঞ্ছনার পর আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের ফলে খুব দীর্ঘ সময় আমরা সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধরে রাখতে পারিনি।

আপনারা জানেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সরকার তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে দেশবাসীর কল্যাণে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের অবস্থা সবই আপনাদের জানা আছে। সারা দেশে রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, কলকারখানা, ঘরবাড়ি, পাকসেনা ও রাজাকারদের তাণ্ডব লীলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রথমেই জনগণের কল্যাণে হাত দিয়েছিলেন দেশ গঠনের কাজে। শূন্য কোষাগার নিয়ে তাকে গড়ে তুলতে হয়েছে রাস্তাঘাট। নির্মাণ করতে হয়েছে শত শত রেল ও সড়ক সেতু। জাহাজ ও ফেরী চলাচলের উপযোগী করতে হয়েছে ফেরীঘাট ও বন্দরসমূহ। স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও সরকারি বেসরকারি ভবনসমূহ নির্মাণের সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ ঘরবাড়ি মেরামতে তিনি ব্যয় করেছেন কোটি কোটি টাকা। তার উপর ছিল এককোটি ছিন্নমূল শরণার্থীর পুনর্বাসন সমস্যা, খাদ্য সংকট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত কল-কারখানা চালু করে অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখা। প্রতিটি শহীদ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও পুনর্বাসন করা।

জাতির জনক বাংলার কৃষকের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করেছিলেন। পাকিস্তান আমলের বকেয়া খাজনা মওকুফ, ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাসজমি বিতরণ, স্বল্পমূল্যে সার ও পাওয়ার পাম্প সরবরাহ, বিনামূল্যে কীটনাশক ঔষধ বিতরণ, কয়েক লক্ষ কৃষি ঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করেছিলেন।

প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে শিক্ষকদের সরকারি চাকুরের মর্যাদা দান, সারাদেশে হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কালাকানুন বাতিল ও স্বায়ত্তশাসন প্রদান, সহজলভ্য গণমুখী শিক্ষা ব্রবস্থা প্রবর্তন ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি উচ্চশিক্ষায় উন্নীত করার জন্য ডঃ কুদরত এ খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন, সকল নাগরিকের সুচিকিৎসার জন্য প্রতি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ, অস্থায়ী স্বাস্থ্য কর্মীদের স্থায়ী চাকুরের মর্যাদা দান, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মদ, জুয়া, হাউজী, রেস খেলা বন্ধ প্রভৃতি কার্যক্রম অত্যন্ত সাফল্যের সাথেই গ্রহণ করেছিলেন। 

এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনী। ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই সেনাবাহিনীতে ছিল না কোন হানাহানি, কোন প্রকার বিশৃঙ্খল অবস্থা। জনগণের সাথে ছিল সেনাবাহিনীর মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠছিল স্বাধীন জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বশান্তির প্রতি অবিচল, দুনিয়ার নিপীড়িত মুক্তিকামী জাতি সমূহের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতি সোচ্চার, বর্ণ-বৈষম্যবাদ বিরোধী সকল জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। যার ফলে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ সহ সমগ্র বিশ্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছিল গৌরবময় ও সম্মানজনক অবস্থান। প্যালেস্টাইনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের নূতন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্যপদ রাভ করেছিল বাংলাদেশ তাঁর নেতৃত্বে। বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মহান অবদানের স্বীকৃতি-স্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ তাঁকে প্রদান করেছিল শান্তির প্রতীক ‘জুলি ও কুরী’ পদক।

দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত গণপরিষদের মাধ্যমে স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই জাতির জন্য একটি সর্বাধুনিক গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার মূল্যবোধকে অক্ষুন্ন রেখে ৭২-এর সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সকল প্রগতিশীল পদক্ষেপ, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তনকে চরমভাবে বাধা দেওয়া শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর থেকেই। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও একশ্রেণীর উগ্র হঠকারী চক্র দেশি-বিদেশি শত্রুদের মদদপুষ্ট হয়ে দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম গড়ে তুলছিল। গুপ্ত হত্যা, সার কারখানায় বিস্ফোরণ, পাটের গুদামে আগুন, থানা ও ফাঁড়ি লুট প্রভৃতি কার্যক্রম বিপ্লবের নামে সারা দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছিল। উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শস্যহানি, বন্যা, বিশ্ববাজারে দৃব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চক্রান্তে নগদ অর্থে কেনা খাদ্যের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে ৭৪-এ দেশে খাদ্যভাব দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সেদিন পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।

এমনি অবস্থায় সকল দুর্যোগ ডিঙিয়ে বাংলাদেশে স্বাবলম্বী অর্থনীতি গড়ে তুলে একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। বহুমুখী গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুষম বণ্টন ব্যবস্থা, শিল্প কারখানায় শ্রমিক শ্রেণীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ। দুর্নীতিমুক্ত গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন, দ্রুততর ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা, সহজলভ্য গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বিনা খরচে সুচিকিৎসার সুযোগ ও শোষিতের গণতন্ত্র তথা সকল শ্রেণীর ও পেশার জনগণের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল দ্বিতীয় বিপ্লবের মূল লক্ষ্য।

দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন জাতীয় ঐক্যের। সে ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ সাংবাদিক, সশস্ত্রবাহিনী, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ছাত্র, আইনজীবী, ডাক্তারসহ সর্বস্তরের পেশাজীবী জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশ গড়ার কাজে একই রাজনৈতিক মঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন। ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা যখন শুরু হল তখনই সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় এজেন্টরা জাতির জনককে হত্যা করে এদেশে সূচিত করেছে সামরিক শাসনের ধারা। জনগণ নয়, ব্যালট নয়, অস্ত্র ও বুলেটই হয়ে উঠলো ক্ষমতার উৎস।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় হত্যা-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। এক উচ্চাভিলাষী সামরিক চক্র একের পর এক হত্যা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার পালা বদল করে চলেছে। এরা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করে অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করার উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ব্যয়, প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে নিজেদের ক্ষমতার ভীত। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে দেশের দুশ্চরিত্র, দলছুট ও সামাজিক অপরাধীদের সমন্বয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে তথাকথিত নির্বাচনের নামে এই শক্তি ক্ষমতাকে চিরদিনের জন্য করতে চায়। 

’৭২-এর গণতান্ত্রিক সংবিধানকে বুটের তলায় চাপা দিয়ে উর্দিপরা ব্যক্তিরা যখন তখন কলমের খোঁচায় সংবিধান পরিবর্তন করেছে। এভাবে গত ১১ বছর কখনো প্রকাশ্যে কখনও অপ্রকাশ্যে, কখনও প্রত্যক্ষ কখনও পরোক্ষ সামরিক শাসন চালু রয়েছে বাংলাদেশে। ’৭৫-এর পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তাদের কেউ এসেছেন বেসামরিক লেবাসে বন্দুকের নলে চেপে বসে, আর কেউ এসেছেন সরাসরি উর্দিপরে বন্দুক হাতে নিয়ে।

গত এগার বছরের সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে স্বৈরাচারী শাসন পদ্ধতির একচ্ছত্র আধিপত্য। এই সামরিক স্বৈরশাসন দেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও জনগণের মৌলিক অধিকারের সকল নীতিমালা ধ্বংস করে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। তাদের হাতে গণতন্ত্র লাভ করেছে আইয়ুবী রূপ। পরিবর্তন হয়েছে মহান স্বাধীনতার সুফল রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সমূহ। জাতীয়করণ বানচালের অশুভ সূচনা, ক্ষমতার স্বার্থে সেনাবাহিনীর মধ্যে হানাহানি, সশস্ত্রবাহিনীকে জনতার প্রতিপক্ষরূপে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা, প্রশাসনের অভ্যন্তরে দুর্নীতির প্রবেশ, রাজনৈতিক দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি ও চরিত্র হননের প্রক্রিয়া, সামাজিক অপরাধীদের প্রশ্রয় দান, জাতির জনকের হত্যাকারী ও জেলখানায় চার জাতীংয় নেতার খুনীদের পুনর্বাসন এবং দূতাবাসের চাকুরী প্রদানের মাধ্যমে পুরষ্কার প্রদান, ব্যাংক ঋণের টাকা, লুটপাট, ক্ষমতাসীনদের কালোবাজারী ও চোরাচালানে অংশগ্রহণ, স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন, সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণীর সৃষ্টি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সূচনা প্রভৃতি অপকর্ম অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সম্পন্ন করেছে এই সামরিক চক্র।

রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বদলে স্বৈরতন্ত্রের ধারা, অর্থনীতিতে অব্যবস্থা ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য, সামাজিক ক্ষেত্রে অনাচার ’৭৫-এর তুলনায় দ্রব্যমূল্যর বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার নিম্নমান সৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিদেশি ভাবধারার আমদানি এবং অবক্ষয়ের ধারা হচ্ছে এই সামরিক শাসন আমাদের শ্রেষ্ঠতম অবদান।

’৮২ সালের ২ শে মার্চ দেশে আবার নতুন পর্যায়ে সামরিক শাসন জারি হয়। চারিত্রিকিভাবে এই সামরিক শাসনও পুরনো ধারার সাথে এক ও অভিন্ন। গত চার বছরের স্বৈরশাসনের ফলে দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, কর্মচারী, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের ও শ্রেণীর জনগণের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘটেছে চরম অবনতি। সামাজিক অনাচার, খুন-রাহাজানি, শিশু-কিশোর হত্যা, নারী নির্যাতন, বোমাবাজি, লুটপাট অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাস, শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, ভ্রান্ত শিক্ষানীতির প্রবর্তন, শিক্ষক সমাজের প্রতি বৈষম্যমূলক বিধি ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

সার, কীটনাশক, পাওয়ার পাম্পসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্যহীনতার সাথে খাজনা, ট্যাক্স, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও রেশনের মূল্য বৃদ্ধি, বিরাষ্ট্রীয়করণের ফলে শ্রমিক ছাঁটাই, ব্যাংক কর্মচারীসহ সরকারি কর্মচারীদের চাকুরীচ্যুতি, ন্যায়সংগত মজুরী ও বেতনের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে দেশের শ্রমিক কর্মচারী ও মধ্যবিত্তের জীবনে উঠেছে নাভিশ্বাস। সরকার বিভিন্ন খাতে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে অনুৎপাদনাশীল খাতসহ সামরিক সামরিক চক্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের কাজ। কৃষিঋণ ও সুদ আদায়ের নামে কৃষকদের উপর চলছে নির্যাতন।

আজ দেশে এক কোটি বিশ লক্ষ বেকার মানবেতর জীবনযাপন করছে। আজ দেশীয় শিল্পের বিকাশ বন্ধ করে পুঁজির নামে দেশি বিদেশি লুটেরা গ্রাস করেছে আমদানী রপ্তানী ব্যবসা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ঋণ, মৎস শিল্প তথা অর্থনীতির সকল শাখা। বর্তমান সামরিক জান্তা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সংবিধান স্থগিত ঘোষণাই করেনি, সংবিধানবিরোধী পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে অবলীলায়। দীর্ঘদিন সামরিক আদালত টিকিয়ে রেখে জনগণের স্বাভাবিক বিচার প্রাপ্তির অধিকার হরণ করেছে। বিকেন্দ্রীয়করণের নামে সুপ্রীম কোর্টের অবকাঠামো পরিবর্তন, এখতিয়ার ও ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

সামরিক শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীয়করণের নামে গ্রাম পর্যায়ে দুর্নীতির প্রসার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছে নির্দ্বিধায়। বিভিন্ন সেক্টর কর্পোরেশন, ব্যাংক, সরকারি সংস্থা, সচিবালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সামরিক ব্যক্তিদের উচ্চ পদমর্যদায় অধিষ্ঠিত করে সৃষ্টি করেছে প্রশাসনিক জটিলতা।

আমার সংগ্রামী দেশবাসী
আপনারা জানেন, এই সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে গত চার বছর ধরে আমরা পাঁচ দফার ভিত্তিতে লড়াই করেছি। আমাদের আন্দোলনের সাথে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, পেশাজীবী, আইনজীবী, শিক্ষকসহ সর্বস্তরের জনগণেরে সংগ্রাম একটি ঐক্যবদ্ধ জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে। পনের দলীয় ঐক্যজোটের আহ্বানে জনগণ ধর্মঘট, হরতাল, বিক্ষোভ, সমাবেশের মধ্য দিয়ে একাধিকবার ঘোষণা করেছে গণরায়। কিন্তু এই স্বৈর সরকার জনমতের তোয়াক্কা না করে বেছে নিয়েছে হত্যা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের পথ। স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে আত্মহুতি দিয়েছেন সেলিম, দেলওযার, মযেজ উদ্দিন ও রবিউল আওয়াল কিরণ।

এমনিভাবে গত চার বছরে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম শহীদ হয়েছেন তিতাস, বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, আসলাম, শ্রমিক নেতা তাজুল, আওয়ামী লীগ কর্মী রমীজ, স্বপন, সোহরাব, মোজাম্মেল দিপালী সাহা সহ দেশ মাতৃকার অগণিত বীর সন্তান।

পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নারী, পুরুষ নির্বিশেষে হাজার হাজার ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, সাংবাদিক ও জনতা। গ্রেফতার, হুঁলিয়া, মিথ্যা মামলা, হয়রানি সহ্য করতে হয়েছে জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক, কর্মচারী, ছাত্র, শিক্ষক ও পেশাজীবী জনগণকে। আজ কারাগারে ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে প্রহর গুনছে ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন, নন্দী। নির্যাতন ভোগ করছেন লতিফ সিদ্দিকীসহ বহু রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। সামরিক আইনে ক্ষমতাসীন এই সরকার শুধু ক্ষমতাই টিকিয়ে রাখেনি, সামরকি শাসনের কড়াকড়ি আরোপ করে আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে কোটি কোটি টাকা অপচয় করে তথাকথিত গণভোট ও উপজেলা নির্বাচনের প্রহসন করেছে। যা সমগ্র বিশ্বে কুড়িয়েছে নিন্দা ও ধিক্কার। শত শহীদেরর ক্ত রঞ্জিত ৫ দফার মূল চেতনা হচ্ছে সামরিক শাসনের চির অবসান।

একটি অবাধ নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে গত চার বছরের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় ঐক্যজোট। 

আমরা দেখেছি, জনগণের আন্দোলনের ফলে বার বার এই সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেও সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় বিরোধী দলসমূহের উপর দোষ চাপিয়ে তারিখ স্থগিত ঘোষণা করে নির্বাচন হতে দেয়নি।

বর্তমান পর্যায়ে সামরিক সরকার একতরফাভাবে গণভোট স্টাইলে একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। অপরদিকে, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের একটি দূরভিসন্ধি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে করে তুলেছিল সংকাটাপন্ন। এমনি একটি সংঘাতময় পরিস্থিতিকে এড়ানোর জন্য গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে আওয়ামী লীগ তথা পনের দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই নির্বাচনকে আমরা সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ৫ দফার পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেট আদায়ের উদ্দেশ্যে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করেছি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি প্রক্রিয়ারূপে চলমান গণআন্দোলনকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই নির্বাচনী সংগ্রাম। 

গত চার বছরের গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের যে তীব্র অনাস্থা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে তাকে এই নির্বাচনী জোয়ারের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সাফল্যে আমরা আরো এগিয়ে নিতে চাই। বাংলাদেশের বুক থেকে সামরিক শাসনের চির অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনী সাফল্যকে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমাদের এই প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ভিত্তিতে শোষণহীন সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে চায়। নির্বাচিত সার্বভৌম জাতীয় সংসদ রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশরূপে গড়ে তুলতে চাই। আওয়ামী লীগ ’৭৫-এর ১৫ই আগস্টে জাতির জনকের হত্যা ও তাঁর পরিবারবর্গ, শেখ মনি, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও কর্ণেল জামিলের হত্যাকাণ্ড এবং ৩রা নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচার চায়। 

মহান স্বাধীনতার সুফল শাসনতন্ত্রের সন্নিবেশিত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি আওয়ামী লীগ যে কোন মূল্যে রক্ষা করবেই। জনগণের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা আমাদের লক্ষ্য। কৃষিক্ষেত্রে যুক্তিসংগত ভূমি সংস্কার, কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের সাথে সাথে দেশের কৃষক ও ক্ষেত মজুরের অবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্তিশালী করতে হলে আমরা মনে করি প্রথমত, বহুমুখী গ্রাম সমবায়ের ভিত্তিতে কৃষক, ক্ষেতমজুর, ভূমির মালিক ও সরকারের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তার সাথে ঘটাতে হবে কুটির শিল্পের প্রসার। 

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি মালিকানাধীন দেশিয় শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের স্বার্থে দেশিয় কাঁচামালের সদ্ব্যবহার, আমদানী হ্রাস, রপ্তানী বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। দেশিয় শিল্প ও ব্যবসার উন্নয়নের লক্ষে গ্রহণ করতে হবে কার্যকর পরিকল্পনা।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বৃহৎ ও ভারী শিল্পের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের উন্নয়নের জন্য গ্রহণ করতে হবে সঠিক, কার্যকর ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা।

রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতার জন্যই আমরা স্থায়ীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সাধন করতে চাই। উপজাতি সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানই আমরা যুক্তিসংগত পথ বলে মনে করি। এই বাংলার হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সকল সংখ্যালঘু নাগরিকের পূর্ণনাগরিক অধিকারে আওয়ামী লীগ বিশ্বাসী। সকল শ্রেণীর ও পেশার জনগণের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত দাবি দাওয়ার প্রতি রয়েছে আমাদের পূর্ণ সহানুভূতি ও সমর্থন। বাঙালির ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ রক্ষায়, সংস্কৃতির বিকাশে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অবিচল ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। 

শ্রমিক শ্রেণীর ন্যায্য দাবী ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার সংরক্ষণ করতে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। আওয়ামী লীগ যে কোন মূল্যে আমাদের জাতীয় সশস্ত্রবাহিনীর মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করতে বদ্ধ পরিকর। সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত না করে তার সত্যিকার উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য।

আমরা চাই বাংলার গরীব দুখী মানুষের সুচিকিৎসার লক্ষ্যে প্রত্যেক থানায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল এবং দেশের চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের উন্নয়ন সাধন। দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সরকারী কর্মচারী, পুলিশ ও আসার বাহিনীর সত্যিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাই। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সক্রিয় ও মর্যাদাসম্পন্ন জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা বিশ্বাসী। প্রতিবেশি দেশসমূহের সাথে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান, মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশের সাথে আত্মমর্যদাসম্পন্ন শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।

আপনারা জানেন, আওয়ামী লীগ এ দেশের জনগণেরই সংগঠন। প্রাসাদের অভ্যন্তরে বা সেনা ছাউনিতে এই দলের জন্ম হয়নি। কোন সামরিক শাসকের পকেট থেকেও বের হয়ে আসেনি। বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিকাশ ঘটেছে দীর্ঘ তিন যুগ ধরে। কোনো ষড়যন্ত্র আমাকে ক্ষমতায় বসিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন দলে পরিণত করবে আমরা তা বিশ্বাস করি না। একমাত্র ব্যালট ও জনগণের ইচ্ছা ভিন্ন অন্য কিছুই ক্ষমতা দখলের উপায় হিসাবে আমরা বিবেচনা করি না। 

আমার সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা
আপনাদেরকে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই আওয়ামী লীগের প্রতি আপনাদের অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু প্রেমিক বাঙালি জাতি আমাকে যে গভীর উষ্ণতায় একাত্ম করে নিয়েছে তা-ই আমার চলার পথের পাথেয়। আজও বাংলার পথে-প্রান্তরে আপনাদের যে প্রাণঢালা সমর্থন, দোয়া ও আশীর্বাদ আমি পাচ্ছি তাতেই প্রমাণিত হয় বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ ও বাংলার জনগণ এক প্রাণ, এক আত্মা।

প্রাণপ্রিয় দেশবাসী
আমি আজ সব হারিয়ে বাংলার মানুষের মাঝে ফিরে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই ফিরে পেতে চাই আমার হারানো বাবা, মা ও ভাইবোনদের স্নেহ-ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু যেমন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ষড়যন্ত্রের সাথে আপোষ করেননি। এই বাংলা বঙ্গবন্ধু পথ ধরেই জনগণের মুক্তির সংগ্রামে আমিও এগিয়ে চলেছি, এগিয়ে যাব। আপনাদের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ও সহযোগিতা আমাদেরকে আরও অনুপ্রাণিত করবে।

আমার প্রিয় দেশবাসী
আমি আপনাদের বলতে চাই, নির্বাচনী এই সংগ্রামে আজ জনতার যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তাকে যদি অন্য খাতে প্রবাহিত করার কোন অপচেষ্টা গ্রহণ করা হয়, জনতার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমরা তার জবাব দিব। আমরা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। নির্বাচনের ফলাফলকে কারচুপি বা অন্য কোন পন্থায় নস্যাৎ করার চেষ্টা হলে আমরা যে কোন মূল্যে তা প্রতিরোধ করবো। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

আমি পুনর্বার আপনাদেরকে জানাচ্ছি সংগ্রামী অভিনন্দন। আপনাদের প্রিয় প্রতীক নৌকা আবার এসেছে সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আপনাদের দ্বারে। সারা বাংলায় আমি দেখে এসেছি নৌকার পালে লেগেছে হাওয়া। জনতার সাগরে জেগেছে উর্মি। আমি বিশ্বাস করি ১৫ দল তথা নৌকার বিজয় হবেই হবে ইনশাল্লাহ্।

খোদা হাফেজ
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ভাষণ প্রদানের তারিখ: ৫ মে, ১৯৮৬

(৭ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বেতার ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পনের দলীয় জোট নেত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত ভাষণ।)

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত