নির্বাচনে গুজব প্রতিরোধে বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত!

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৩২

রাজেশ চক্রবর্তী

সিটিজেন জার্নালিজমের যুগে আমারা প্রত্যেকেই এক একজন সাংবাদিক। দৈনন্দিন জীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকান্ডগুলোও এখন ভার্চুয়াল জগতের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ভার্চুয়াল জগতে আমরা কি শেয়ার করছি তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দিনে দিনে এই ভার্চুয়াল দুনিয়ার ব্যবহারকে আমরা একটা অসম প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছি যা আমাদের সমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর। ইদানিং যাচাই-বাছাই না করেই কে কার আগে শেয়ার দিবো এই ধরনের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার আস্ফালন দেখা যায় বিভিন্ন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। নিজেদের অজান্তেই হয়ে উঠি আন্দোলনের একটা অংশ। সত্য নাকি মিথ্যা, আদৌ এর সোর্স বিশ্বাসযোগ্য কিনা, তার কোন কিছু যাচাই না করেই যা দেখি তাই বিশ্বাস করি এবং নিজেরাও প্রচার করি। 

আন্তেনিয় গ্রামসি - ইতালির বিখ্যাত একজন সমাজ দার্শনিক। তার একটি বিখ্যাত লেখা “প্রিজন-নোটস”। সেখানে তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারনা দিয়েছেন যা হল – “প্যাসিভ-রেভ্যুলুশান”। যার অর্থ কোন প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে জনতার সচেতনতা তৈরি করে গনজাগরণের মাধ্যমে একটা বিপ্লব সাধন করা যা আদতে জনতার স্বার্থের বিপ্লব নয় বরং কোন ব্যাক্তি বা দলের স্বার্থে সংগঠিত। এটা বলা যায় জনগনের দ্বারা জনগনের বিপ্লব কিন্তু সেই বিপ্লব জনগনের জন্য না। এই ধরণের রেভ্যুলুশানে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হয় জনগণ ও রাষ্ট্রের, আর লাভবান হয় নির্দিষ্ট দল ও ব্যক্তি। যে কোন দেশে প্যাসিভ-রেভ্যুলুশান হওয়ার প্রধান কারন যারা নাগরিকদের প্যাসিভ-রেভ্যুলুশানিস্ট হতে উৎসাহিত করছে তাদের স্বার্থপরতা ও নাগরিকদের বোকামি।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে সংঘঠিত ‘কোটা বিরোধী’ ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন প্যাসিভ-রেভুলেশনের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথমদিকে যদিও এগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল কিন্তু পরবর্তীতে এতে ঢুকে পরে স্বার্থপর অপশক্তি। যারা বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা চালিয়ে জনসাধারণকে প্যাসিভ-রেভ্যুলুশানিস্টে পরিনত করে যাতে লুকিয়ে ছিল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠির স্বার্থ। বাংলাদেশে এই ধরণের প্যাসিভ-রেভ্যুলুশানের ইতিহাস খুব সমৃদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ষড়যন্ত্রকারীরা নানান সময়ে গুজব ছড়িয়ে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে। তৎকালীন সময়ে ‘ইন্দিরা-মুজিব’ চুক্তি যা ‘বাংলাদেশ-ভারত’ চুক্তি নামে স্বাক্ষরিত হয় যাতে দুটি রাষ্ট্রের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহায়তা ও সার্বভৌমত্ব প্রাধান্য পায়। তখন এই চুক্তিকে ২৫ বছরের গোলামির চুক্তি বলে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারকে বিশ্বের দরবারে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য দুর্ভিক্ষের সময় বাসন্তিকে মাছের জাল পরিয়ে ছবি তুলে সেই ছবি রপ্তানি করা হয় বিদেশে যার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বহির্বিশ্বে সরকারের ইমেজ নষ্ট করে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে ক্ষমতাচ্যুত করা।

পার্বত্য শান্তি চুক্তি, গঙ্গা পানি চুক্তি, শাপলা চত্বরে কয়েক হাজার হেফাজত কর্মী হত্যা, কোটা আন্দোলনে ছাত্র হত্যা, সর্বশেষ দুটি ছাত্রের চোখ তুলে ফেলা, পার্টি অফিসে ধর্ষণসহ নানাধরণের গুজব সন্ত্রাস চালিয়েছে একটি চিহ্নিত মহল যার আদৌ কোন ভিত্তি বা প্রমাণ ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফেইক নিউজের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম ফলহা দ্য সাও পাওলোতে এগিয়ে থাকা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বলসোনারো ও তার সমর্থকদের মিথ্যা তথ্য প্রচারনা নিয়ে একাধিক সংবাদ ছেপেছিল। যেখানে বলসোনারোর বেআইনী ব্যবসা পরিচালনা ও হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে ১০ লাখের ও বেশী মানুষের কাছে তার সমর্থকদের মিথ্যা তথ্য প্রচারের কথা উঠে আসে। এই সংবাদ ছিল গুজবের মত যা বলসোনারোর কর্মী সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছিল। কেনিয়াতে ও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে কিছুদিন আগে। গুজব সন্ত্রাসের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে পেসিভ রেভুলেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া যে চিহ্নিত স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্য সেটি এখন স্পষ্ট। তাই পেসিভ রেভুলেশনের অংশ হওয়ার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে আমরা যা বিশ্বাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছি তার সত্যতা কতটুকু! চোখের সামনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাই দেখলাম তাই বিশ্বাস করে শেয়ার করে দিলাম – এই প্রবনতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবেই। নইলে সমাজ ও রাষ্টের অপূরণীয় ক্ষতির জন্য দায়ী থাকব আমরাই। 

লেখক: সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

নির্বাচনী অভিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে jagoroniya.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত