আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০১৮, ১৬:২৪

মুনীরা খান

দেশের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে আমরা যেমন ভেবেছিলাম— সামনে তো জাতীয় নির্বাচন, কাজেই সেই নির্বাচনের আগে আগে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হচ্ছে, কোনো অনিয়ম বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনো কিছু ঘটবে না। সত্যি বলতে, আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সার্বিকভাবে নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত যতটুকু পর্যবেক্ষণ করেছি, তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ব্যাপার পাইনি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, যত দূর সম্ভব এই তিন সিটির নির্বাচন ইসির জন্য চ্যালেঞ্জিং এবং নিরপেক্ষ হবে, কারো কোনো অভিযোগ থাকবে না; একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন তিনি উপহার দেবেন। তিনি কোনো পক্ষপাত করবেন না এবং সুন্দর পরিবেশে মোটামুটিভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। কিন্তু না, চিরাচরিতভাবে একই রকম নির্বাচন হলো। ভোটের দিন দুপুর ১টা; আমি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের স্টুডিওতে ছিলাম, সেখানে থেকে যা কিছু দেখলাম, তাতে এবারের নির্বাচনে আমাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন সেভাবে দেখতে পাইনি। যেকোনো নির্বাচনে সাধারণত এমন প্রার্থীকেই দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়, যাঁদের সমাজে পরিচিতি এবং ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে। আমরা টেলিভিশনে দেখলাম বরিশালে বেশ কয়েক জায়গায় কিছু অনিয়মের খবর। প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন কিছু কেন্দ্রে, এমন খবরও আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এমন অবস্থা আমরা আশা করিনি। এর আগে যখন বরিশালে নির্বাচন হয়েছিল—আওয়ামী লীগের সময়েই নির্বাচন হয়েছিল, তখন কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কারো কোনো রকম অভিযোগ ছিল না। তখন কেউ নির্বাচন বর্জনও করেননি।

আজ দুটি বিষয় বিশেষভাবে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বরিশালে ডা. মনীষা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এটি আমাকে খুবই আহত করেছে। কারণ তিনি একজন নারী। একজন নতুন মেয়ে, যিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন—তিনি মানুষের কাছে জনস্বার্থে সেবামূলক কাজ করে পরিচিতি পেয়েছেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন সাধারণ মানুষের আন্তরিক ইচ্ছার কারণেই। তাঁকে মানুষ টাকা-পয়সা দিয়েও সহযোগিতা করেছে। এটি আমাদের একটি বড় প্রত্যাশার জায়গা ছিল। কারণ রাজনীতির বাইরের একটি নতুন মেয়েকে ভোটাররা কিভাবে গ্রহণ করে—এটি একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু তাঁর ওপর যে হামলা হলো, এটি খুবই অনভিপ্রেত। তাঁকে প্রটেকশন দেওয়াটা সবার দায়িত্ব ছিল। তার মানে নতুন কণ্ঠস্বর বা বিকল্প কোনো প্রার্থীর ক্ষেত্রে আমাদের মানসিক অবস্থা তৈরি হয়নি। সবার তরফ থেকেই বড় একটি চ্যালেঞ্জ বা পরীক্ষা ছিল যে এ ধরনের প্রার্থী, যিনি কোনো রকম টাকা-পয়সা খরচ না করেই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন, মানুষের মন কতটা তিনি জয় করতে পারছেন এবং এই স্কেলটা কত দূর যেতে পারে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা খুব যৌক্তিক ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই ব্যাপারটি ঘটতে পারল না। এটাতে আমি পর্যবেক্ষক হিসেবে আহত হয়েছি।

ভোটকেন্দ্রে কাউকে মোবাইল নিতে দেওয়া হবে না—এটা আগে থেকে বলা হয়নি। ফলে হঠাৎ এমন নিয়ম জারির কারণে মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। আগে থেকে বলে দেওয়া উচিত ছিল যে ভোটকেন্দ্রে কোনো ফোন নিয়ে আসা যাবে না। অনেক পোলিং এজেন্ট বলেছেন, তাঁরা বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না। ফলে অনেকে ভোটকেন্দ্রে এসেও ভোট না দিয়ে ফিরে গেছে। অনেকে অন্যের কাছে মোবাইল গচ্ছিত রেখে ভোট দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল, এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া।

আর ইভিএম প্রসঙ্গটা নিয়ে যে সংকট আগেও ছিল, এবারও সেটা কাটিয়ে ওঠেনি নির্বাচন কমিশন। ইভিএম নিয়ে আমি সব সময়ই কথা বলি এবং এটার ওপর গুরুত্বারোপ করি। কারণ মানুষ এখনো এ বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। অনভ্যস্ততার কারণে দুই ঘণ্টায় ১৮ জন ভোট দিতে পেরেছে। অনেকে বাড়িতে কাজ ফেলে রেখে এসেছে। তাড়াতাড়ি ভোট দিয়ে চলে যাবে। সে সুযোগ তারা পায়নি। এতে যেটা হয়, মানুষ ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। পরবর্তী সময়ে ভোট দিতে আসার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহ হতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের আরো সতর্কতা ও প্রশিক্ষণ দরকার। তা না হলে এটা আমাদের আরো ভোগাবে।

নির্বাচনের আগেই পোলিং এজেন্টদের সব কিছু বুঝিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়াটা নিয়ম। কিন্তু এবারের নির্বাচনেও এ নিয়ে অনিয়ম দেখা গেল। শোনা গেল, ৫০ জন পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন থেকেই কয়েকজনকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিষয়গুলো দূর করা উচিত ছিল।

জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে সুন্দর ও আদর্শ নির্বাচনের মডেল হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ছিল আমাদের, সেটা হয়নি। পরিবেশের প্রতিকূল অবস্থার কারণে প্রার্থীরা মন খারাপ করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের খবর তো আছেই, হামলা ও কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ইসি তার কাজে কতটা দায়িত্বশীল ও আন্তরিক তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে; কিন্তু তারা চাইলেই এসব ছোটখাটো বিষয়ে সতর্ক থেকে একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারত।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, ফেমা
অনুলিখন: মাসউদ আহমাদ
প্রথম প্রকাশ: কালেরকণ্ঠ, ৩১ জুলাই, ২০১৮

নির্বাচনী অভিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে jagoroniya.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত