রাজশাহীতে ভোটের ভিন্ন অভিজ্ঞতা

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০১৮, ১৬:২১

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে যেভাবে ভোটকেন্দ্র দখল কিংবা কারচুপির আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ব্যক্ত করা হচ্ছিল, তার ছিটেফোঁটাও ভোটকেন্দ্রগুলোতে লক্ষ করা যায়নি। ভোটে জয়-পরাজয়ের শঙ্কা থাকতেই পারে। কিন্তু ভোটকেন্দ্র দখল কিংবা ভোট ডাকাতির মতো কোনো পরিবেশ রাসিক নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থী তৈরি করেননি কিংবা সেই সুযোগ নেওয়ার মনোভাবও তাঁদের নেতাকর্মীদের মনে দেখা যায়নি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও সমর্থকদের মধ্যে উত্তাপ-উত্তেজনা আছে, এ জন্যই নির্বাচনকে উৎসবমুখর বলা হয়। রাসিক নির্বাচনের পরিবেশ যেমন দেখলাম, তাতে পরিষ্কার করেই বলা যায় যে এটি একটি সুষ্ঠু ধারার প্রভাবমুক্ত নির্বাচন। ভোট চলাকালীন বিএনপির পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। কারণ বিএনপি-জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীরা কাউন্সিলরের ভোট করলেও তাঁরা এবং তাঁদের পোলিং এজেন্টরা বিএনপির মেয়র প্রার্থীর ভোটের কাজ করেছেন বিনা বাধায়। আর বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের অনেকেই নিজস্ব শঙ্কা থেকেই ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে আসেননি। অথচ বিএনপির পক্ষ থেকে সব সময়ই নানা অভিযোগ ও হুমকি অব্যাহত ছিল। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওই সব অভিযোগ অনেকটাই অমূলক।

সরকারি দলের মেয়র প্রার্থী প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটে প্রভাব খাটাতে পারেন—এমন উৎকণ্ঠা বিএনপির প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে অতিমাত্রায় লক্ষ করা গেছে। রাজশাহী মহানগরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণা, পোস্টার-ব্যানার ও ফেস্টুন যেভাবে লক্ষ করছিলাম, ঠিক সেভাবেই ভোটকেন্দ্রগুলোতেও নৌকা প্রতীকের ব্যাজ পরে কর্মীদের কাজ করতে দেখেছি। অন্যদিকে ভোট চলাকালীন বিএনপির প্রার্থীর কর্মীসংকট যথেষ্ট চোখে পড়ার মতো ছিল। প্রচার-প্রচারণায় যেমনটা তারা পিছিয়ে ছিল, ভোট চলাকালীনও তাদের সেই সাংগঠনিক দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো ছিল। ভোটকেন্দ্র দখল কিংবা কারচুপি বলতে যা বোঝায়, তা রাসিকের কোনো কেন্দ্রে লক্ষ করা যায়নি কিংবা শুনতেও পাইনি।

নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, সরকারি দলের প্রভাব থাকবে কি না—এসব প্রশ্নে গত এক মাস সব গণমাধ্যম ছিল সোচ্চার। শুধু গণমাধ্যম নয়, দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের দৃষ্টি ছিল সিটি নির্বাচনের দিকে। বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া রাসিক নির্বাচনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। একটি প্রভাবমুক্ত ও শঙ্কামুক্ত নির্বাচনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে রাসিক নির্বাচনকে ধরা যেতে পারে। যথাযথ নিরাপত্তা ও উৎসবমুখর পরিবেশে আমি নিজেই লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভোটটা দিতে পেরেও অনেকটা স্বস্তি বোধ করছি।

স্থানীয় নির্বাচন হলেও এটি মূলত জাতীয় রাজনীতিকেই মঞ্চস্থ করেছে, তা আমরা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছি। নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে রাসিক নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে সরকারের অধীনে সরকারি প্রভাবমুক্ত শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচনের ধারা। এই নির্বাচনের আরো একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেখে অনেকটা আনন্দিত হয়েছি যে গণমাধ্যমকর্মীদের তাঁদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই সহযোগিতা করেছেন। গণমাধ্যম যখন স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রভাবমুক্তভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছে, তখন নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হতে পারে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের স্বচ্ছ তৎপরতার প্রভাবে ও জনসচেতনতার কারণে কোনোভাবেই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে কিংবা ভোট কারচুপি করে ভোটে বিজয়ী হওয়া যায় না।

নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া, না-হওয়া, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকা, না-থাকা প্রভৃতি বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত-দ্বিমত নির্বাচনের আগে থেকেই লক্ষ করছিলাম। কিন্তু নির্বাচন চলাকালীন অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্য দিয়েই রাসিক নির্বাচনে ভোটার, কর্মী ও প্রার্থীদের কাজ করতে দেখা গেছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যেমন পরীক্ষা হয়েছে, ঠিক তেমনি নির্বাচন কমিশনেরও।

একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নির্বাচনপদ্ধতির ওপর নাগরিকদের স্থায়ী আস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বচ্ছ নির্বাচনব্যবস্থাই এখন সবার প্রত্যাশা। আমাদের দেশে একসময় নির্বাচনে ভোট ডাকাতি, বুথ দখল ও সিল মারার গণতন্ত্র ছিল। রাসিক নির্বাচন দেখে মনে হয়েছে, আজ সেই অধ্যায় নেই। নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে, তাহলে ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারে। রাসিক নির্বাচন সেটাই প্রমাণ করেছে। রাসিক নির্বাচনে আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও ভোটারদের যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে দেখা গেছে। রাসিক নির্বাচনকে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন বলা না গেলেও শতভাগের কাছাকাছি যেতে পেরেছে বলে মনে হয়। প্রসংগত বলতে হয়, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না, যদিও এর জন্য কমিশনের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। তবে এর জন্য আরো প্রয়োজন সরকার তথা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছা, রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলতা এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা। আর এগুলোর বেশির ভাগই রাসিক নির্বাচনে লক্ষণীয় ছিল। সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা লক্ষ করা যায়নি। তবে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষ থেকে যথেষ্ট আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতা লক্ষ করা গেছে। কাজেই আমরা আশা করব, রাসিক নির্বাচনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাই ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে অব্যাহত থাকুক।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]
প্রথম প্রকাশ: কালেরকণ্ঠ, ৩১ জুলাই, ২০১৮

নির্বাচনী অভিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে jagoroniya.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত