উন্নয়নে আ.লীগের কাছে ‘ধরাশায়ী’ বিএনপি’র সরোয়ার-কামাল

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৮, ১৮:১৩

জাগরণীয়া ডেস্ক

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে গত ১৬ বছর নির্বাচিত ৩ মেয়রের মধ্যে ২ জন ছিলেন বিএনপি সমর্থিত আর একজন আওয়ামীলীগ সমর্থিত। তবে বিএনপি সমর্থিত ওই ২ মেয়রকে পেছনে ফেলে বরিশাল মহানগরীর সর্বাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র। তারা প্রত্যেকেই একবার করে মেয়রের দায়িত্ব পালন করলেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের উন্নয়নে ধরাছোয়ার বাইরে ছিলেন বিএনপির অপর ২ মেয়র এ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার ও বর্তমান মেয়র আহসান হাবিব কামাল।

শওকত হোসেন হিরনের দায়িত্বকালে নগরীর উন্নয়ন প্রকল্পের নিজ ঘোষিত বাজেটের বাস্তবায়ানের শতকরা হার ৪৩.০১%। আর নগরীর উন্নয়নে নিজ নিজ ঘোষিত বাজেট মধ্যে সিটির প্রথম মেয়র (বর্তমানে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও দলটির যুগ্ন মহাসচিব) এ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার শতকরা ২৪.২৬% এবং আহসান হাবিব কমাল ৩৭.৭১% বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়।

সরোয়ার নিজ ঘোষিত উন্নয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ৩ মেয়রের মধ্যে সর্বশেষে অবস্থান করছেন। আর নিজ নিজ ঘোষিত সর্বাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে প্রথম স্থানে আ.লীগ সমর্থিত মেয়র শওকত হোসেন হিরন ও দ্বিতীয় অবস্থানে আহসান হাবিব কামাল। তবে বিএনপি সমর্থিত বর্তমান মেয়র আহসান হবিব কামাল কাগজে কলমে সর্বোচ্চ বাজেট বাস্তবায়ন করলেও অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্খিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন নগরবাসী।

২০০২ সালে যাত্রা শুরু করা বরিশাল সিটি কর্পোরোরেশনে সর্বমোট ১৫টি বাজেট ঘোষণা করা হয়। এরমধ্যে পৃথকভাবে চারটি করে আটটি বাজেট ঘোষণা করেন বিএনপি সমর্থিত নির্বাচিত দুই মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার ও আহসান হাবিব কামাল। আর আ.লীগ সমর্থিত মেয়র শওকত হোসেন হিরন মাত্র ৪টি বাজেট ঘোষণা করেন। বাকি তিনটির মধ্যে দুইটি বাজেট ঘোষণা করেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র বিএনপি নেতা আওলাদ হোসেন দিলু ও একটি আলতাফ মাহমুদ সিকদার। 

এসব বাজেট পর্যলোচনায় দেখা যায়, বরিশাল সিটির নগর পিতা হিসেবে বিএনপি নেতা মজিবর রহমান সরোয়ার তার মেয়াদে প্রথম প্রস্তাবিত বাজেটের ১২.৫৮%, দ্বিতীয় বাজটের ১৬.৯৪%, তৃতীয় বাজেটের ১৪.৬০% ও চতুর্থ বাজেটে ৪৮.৯০% বাস্তবায়ন করেন। সবমিলিয়ে তার আমলে বাজেটের ২৪.২৬ % বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন।

অপরদিকে দ্বিতীয় মেয়র শওকত হোসেন হিরনের প্রথম বাজেটে ৩৭.১০%, দ্বিতীয় বাজেটে ৫৩.৩৯%, তৃতীয় বাজেটে ৪৩.৮৮%, ও শেষ বাজেটে ৩৭.৬৬% বস্তবায়ন করেন। তার বাজেট বাস্তবায়নের হার ৪৩.০১%। সিটির তৃতীয় মেয়র আহসান হাবিব কামাল তার প্রথম মেয়াদে (আলতাফ হোসেনের ঘোষিত বাজেট) ৩৭.৩৩%, দ্বির্তীয় মেয়াদে ৩৬.১৫%, তৃতীয় মেয়াদে ৪৩.১৮%, চতুর্থ মেয়াদে ৩৪.১৭% বাজেট বাস্তবায়ন করেন। সব মিলিয়ে তার বাজেট বাস্তবায়নের হার ৩৭.৭১ %।

বিএনপি (মজিবর রহমান সরোয়ার ২০০৩-২০০৪) : ঘোষিত বাজেটগুলোর বিষদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভোটে নির্বাচিত প্রথম মেয়র বিএনপির নেতা মজিবর রহমান সরোয়ার তার প্রথম বাজেট পেশ করেন ২০০৩ সালের ৭ জুলাই। কোন প্রকার কর আরোপ ছাড়া (২০০৩-০৪) অর্থবছরের ওই বাজেটে ২শ ৩৩ কোটি ৩ লক্ষ টাকার প্রস্তাবিত বাজেটসহ ২০০২-০৩ অর্থ বছরের সংশোধনি বাজেট আকারে প্রায় ২৫ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। বাজেটের শুরুতে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, যে শিশুটি আজকে জম্ম নিয়েছে প্রথমেই তার জম্ম নিবন্ধীকরণের মাধ্যমে কর্পোরেশনের সেবা শুরু হয়।

পরে তার সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি, তার চলাচলের স্বাচ্ছন্দতা, চিত্ত বিনোদন, প্রাথমিক চিকিৎসা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ইত্যাদি দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের পালন করতে হয়। পরিশেষ সুন্দর পরিবেশে সমাধিস্থ করা বা মরদেহ দাহ করার জন্য উপযুক্ত ও সুন্দর জায়গার ব্যবস্থাও কর্পোরেশনকেই করতে হয়। এরপর তিনি সিটিসহ বর্ধিত ওয়ার্ডের উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে বলেন, তিনবার সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় সংসদের হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। অনেক দেশে রাষ্ট্রয় সফর করেছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বরিশাল শহরকে সুবিনাস্থ ভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি।

কর্পোরেশনের ইতিহাসে প্রথমবারের মত শহরবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়ে সরোয়ার বলেন, বরিশালে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। পানি সরবরাহ, সড়ক বাতি, বস্তি উন্নয়ন কার্যক্রম, পরিস্কার পরিচ্ছনতা ও চিত্ত বিনোদনের জন্য কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এছাড়া ট্রাক টার্মিনাল, চিরিয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন স্থাপনে আশাবাদ ব্যক্ত করি। ভবিষ্যত পরিকল্পনা হিসাবে তিনি বলেন, বরিশাল সিটির প্রবেশ দ্বাড়সমূহে সিটি গেইট নির্মান, পুরান বাজার ও নিউমার্কেটে সংস্কার ও উন্নয়ন, বরিশাল অডিটরিয়ামে কমিউনিটি সেন্টার ও কনফারেন্স রুমসহ সান্ধ্যকালীন বাজার স্থাপন, হাসপাতাল রোড ও নবগ্রাম রোড প্রশস্তকরণ, রাখাল বাবুর পুকুর উন্নয়ন ও সংস্কার, হরিজনদের জন্য উন্নত বাসস্থান, সদর হাসপাতাল মোড়-কাঠপট্টি মোড়-কাকলী হলের মোড়সহ জেলাখালা মোড় প্রসস্তকরণসহ নথুল্লাবাদ ও রুপাতলী বাস টার্মিনালে দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা নির্মান। অশ্বিনী কুমার টাউন হল সংস্কার কাজসহ শহীদ মিনারের উন্নয়ন ও কেন্দ্রীয় কবরাস্থানের নির্মান। বাজেট বক্তব্যের পরিশেষে আল্লাহাফেজ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ জিন্দবাদ বলে বক্তব্য শেষ করেন। বিশাল আকারের বাজেটের বছর শেষে বাস্তবায়িত হয় প্রায় ২৯ কোটি ৩৩ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ১২.৫৮%।

(২০০৪-২০০৫): ২০০৪ সালের ১২ জুলাই ২য় বারের মত বাজেট নিয়ে হাজির হন বিএনপির মেয়র সরোয়ার। কর আরোপ ছাড়া বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড ও নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০০৪-০৫ অর্থবছরের ২২১,৭৪,০১,৫৭২ টাকার প্রস্তাবিত বাজেটসহ ২০০৩-০৪ অর্থ বছরে ২৯,৩২,৬৫,৭৫১ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন। তিন বারের সংসদ ও একবার হুইপসহ বহুবার বিদেশ ভ্রমণকরা অভিজ্ঞ সরোয়ার মেয়র দায়িত্বে দুই বছরের মাথায় কিছুটা অস্বস্থিতে পড়েন বলে তার বাজেট বক্তব্যে ওঠে আসে।

প্রথম বাজেট বক্তব্যের শুরুতে অনেক সাহস ও আশার বাণী শুনালেও দ্বিতীয় বাজেটের শুরুতে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনে প্রয়োজনের তুলনায় আয় অপ্রতুল, কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় দ্বাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও অফিস ব্যায় মিটানোর পর এই সুবিশাল এলাকার উন্নয়ন কাজ করা খুবই কস্টের। সেজন্য সরকার ও দাতাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তারা না দিলে অনেই উন্নয়নই প্রতিশ্রুতি থেকে যায়। সরোয়ারের লিখিত এই বাজেট বক্তব্যে বেশিভাগ স্থান জুড়ে রয়েছে গত এক বছরের উন্নয়নের ৩০ ওয়ার্ডে বেশকিছু রাস্তার মোড় ও সড়ক প্রশস্তকরণ, ড্রেন নির্মাণ ও সড়ক দখল মুক্ত করাসহ কিছু উন্নয়নের কথা। বক্তব্যের এক পর্যায়ে সরোয়ার বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ৩০ ওয়ার্ডে ৩৮.২৭ কিমি রাস্তা ও ১২.৮৪ কিমি ড্রেনসহ মোট ১৪৬ টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যার অধিকাংশই সমাপ্তের পথে। তবে কি কি সে প্রকল্প তা বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি।

এছাড়া প্রথম বাজেটে দেয়া নানা প্রতিশ্রুতি বেমালুন ভুলে গিয়ে ফের নগরবাসীকে আশার বাণী শুনিয়ে সরোয়ার বলেন, নগরীতে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত তিন তলা মার্কেট নির্মাণ, বিবির পুকুর পারের দক্ষিণ পার্শ্বের বহুতল সুপার মার্কেট নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে যার কাজ অচিরেই শুরু হবে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিপনী কেন্ত্র স্থাপনের ইচ্ছাও পোষন করেন তিনি। পাশাপাশি প্রথম বাজেটের মত এবারেও হরিজনদের জন্য কোয়াটার নির্মাণ, চিরিয়াখানা, শিশুপার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, আধুনিক অডিটরিয়াম ও হকার্স মার্কেট নির্মানসহ অল্প দিনের মধ্যে ১০ টি প্রকল্প নির্মান শুরুর আশ্বাস দেন।

এছাড়া পানি সরবরাহের জন্য ২ টি নলকূপ স্থাপন ও পাইপলাইন করার কথা উল্লেখ করে দুইটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রকল্প নেয়ার কথা বলেন। বর্ধিত এলাকার জন্য ১৬ টি নলকূপ ও ২৫ কিমি পাইপলাইন স্থাপনের পাশপাশি আশ্বাস দেন মহানগরে পানি সরবরাহ ও পয়: নিস্কাসনে কাজ শুরু করা হবে । নগরীতে ১০ টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ২ টি নগর মাতৃসনদ কেন্দ্র স্থাপন হবে। এবার বাজেট বক্তব্যের শেষে তিনি আল্লাহাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দবাদ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন জিন্দাবাদ বলে বক্তব্য শেষ করেন। বছর শেষে ঘোষিত বাজেটের বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ৩৭ কোটি ৫৭ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার ১৬.৯৪%।

(২০০৫-২০০৬): তৃতীয় বারের মত ২০০৫ সালের ২০ জুলাই সিটি কর্পোরেশনের বাজেট ঘোষণা করেন সরোয়ার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৩২৯,৫৬,২০,৭২২ টাকার প্রস্তাবিত বাজেটসহ ২০০৪-০৫ অর্থ বছরের ৩৭,৫৭,১৭,২০৮ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন তিনি। সরোয়ারের বাজেট বক্তব্যের শুরুতে প্রথমবারেরমত ওঠে আসে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিষদ নিয়ে সমস্যার কথা। আয় অপ্রতুল উল্লেখ করে উন্নয়নয় কর্মকান্ড পরিচালনা করার খুবই কস্টের কথা দ্বিতীয় বারের মত পুনরাবৃত্তি ঘটে একাধিকবার সংসদ সদস্য ও বহু দেশে ভ্রমণকারী অভিজ্ঞ সরোয়ারের মুখে। তাই বক্তব্যের শুরুতে এবার সরকারী বরাদ্দ ও দাতাদের কথা উল্লেখ না করে উন্নয়নে বরিশালের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

তৃতীয় বাজেটে এসে অভিজ্ঞ সরোয়ার বুঝলেন নগরবাসী কর পরিষধ না করলে নাগরীক সুযোগ সুবিধা অব্যহত রাখা সম্ভব নয়। তাই নগরবাসীর কাছে সরোয়ারের প্রশ্ন ‘আপনারা যদি আপনাদের উপর অর্পিত কর পরিশোধের দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে আমরা কি ভাবে রাস্তাঘাট, ড্রেন, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য সেবাসহ অন্যান্য নাগরিক সুযোগ সুবিধা অব্যাহত রাখব?

বিগত দিনের উন্নয়নের একটি ছক তুলে ধরার চেষ্টা করে সরোয়ার বলেন, ৫২. ১৩ কিমি রাস্তা নির্মান, পুন:নির্মান, প্রশস্তকরণ কাজে ব্যায় ১০,৭৪,৭৭,২২৫ টাকা। ২৪.৩৬ কিমি পাকা ড্রেন নির্মানে ব্যায় ৩,০৯,৮২,২০৫ টাকা, ২৬ টি বক্স কালভার্ট নির্মানে ব্যায় ১,২৪,৩২,১১২ টাকা। ২৯ টি ক্রোস ড্রেন নির্মানে ব্যায় ১,০১,৫৩৬ টাকাসহ অন্যান্য ৩১ প্রকল্পে ব্যায় ৪০,৩৬,৩২০ টাকাসহ সব মিলিয়ে ১৫,৫০,২৯,৩৯৮ টাকা ব্যায় হয়েছে। এছাড়াও ২০ টি সড়ক মোড় প্রশস্ত করন ও সংস্কার বা নির্মান করা হয়। পাশাপাশি প্রথম ও দ্বিতীয় বাজেটে অনেকগুলো প্রতিশ্র“তির মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল অডিটিরিয়াম ভবন সংস্কার করা হয়।

বক্তৃতায় সরোয়ারের প্রথম ও দ্বিতীয় বাজেটের প্রতিশ্র“তিগুলো পুনরায় উল্লেখ করে বাস্তবায়নে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলেন। এসব পরিকল্পনার পাশাপাশি লিখিত বক্তব্যের প্রায় ৬ পাতা জুড়ে নগরীর উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ ও আশ্বাসের কথা ফের উল্লেখ করেন সরোয়ার। এসব প্রকল্পর নামের শুরতে লেখেন ‘হাতে নেয়া হয়েছে, গৃহীত হয়েছে, খুব শীঘ্রই সম্পন্ন হবে, কাজ চলছে, অচিরেই শুরু হবে, প্রকল্প নেয়া হয়েছে, সীদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে’। বছর শেষে তার বাজেটের বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ৪৮ কোটি ১০ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার ছিল ১১৪.৬০%।

(২০০৬-২০০৭): ২০০৬ সালের ৩১ জুলাই মেয়র হিসেবে চতুর্থ বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সরোয়ার। নতুন ভাবে কর আরোপ ছাড়া ২০০৬-০৭ অর্থবছরের ৩৩৩,৪৪,৮৬,৮৭৫ টাকার প্রস্তাবিত বাজেটসহ ২০০৫-০৬ অর্থ বছরের ৪৮,১০,৫৪,৮৭৪ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন। বরাবরের মত এবারেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পাশাপাশি নতুন করে ঠিকাদারদের বিল পরিষদ করে উন্নয়ন কর্মকান্ডে কস্টের কথা উঠে আসে সরোয়ারের মুখে।

তার এই শেষ বাজেট বক্তব্যে বিগত দিনে নানা প্রতিশ্র“তি থেকে নিজেকে দায় মুক্তি চেষ্ঠা করলেন অভিজ্ঞ সরোয়ার। তিনি নগবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের উপর অর্পিত কর নিয়মিত পরিষধের দায়িত্ব সাঠিকভাবে পালন করলেই আমরা নাগরিক সুবিধা আরো নিশ্চিত করতে পারবো। বিশ্ব ব্যাংক ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ অর্থায়নে বিভিন্ন সড়ক প্রশস্ত, সংস্কার ও ড্রেন নির্মানের কথা তুলে ধরেন।

একই সাথে নগরীতে সাতটি মার্কেট নির্মান, একটি ফোয়ারা নির্মানসহ একটি সিটি গেট নির্মানের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া বাজেটে আরো ২০ টি রাস্তা সংস্কার, প্রশস্তকরন ও নির্মানসহ বেশকিছু উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলেন। পাশাপাশি সরকারি ও নিজস্ব তহবিলে বেশ কিছু মার্কেটসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বিজলীবাতিসহ সৌন্দর্য বর্ধনের কিছু আশার বাণী শোনান। স্থানীয় অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নগর দারিদ্র দূরীকরণে কিছু কাজ শেষ ও কিছু পরিকল্পনার নেয়ার পাশাপাশি বেশকিছু উন্নয়ন তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

তবে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা, চলাচলের স্বাচ্ছন্দতা, চিত্ত বিনোদন, প্রাথমিক চিকিৎসা, সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ নানা উন্নয়নের প্রতিশ্র“তির কথা বেমালুন ভুলে গেলেন তিনবারের সাংসদ চিপহুইপ ও বহুদেশ ভ্রমণকারী অভিজ্ঞ সরোয়ার। বছর শেষে বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ১৬৩ কোটি ০৪ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ৪৮.৯০%।

মজিবর রহমান সরোয়ারের সবকটি বাজেটে নগরীর সড়ক-ড্রেন ব্যাবস্থাপনার উন্নয়নের কথা থাকলেও ২০০৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে বাজেট বক্তৃতাকালে ভারপ্রাপ্ত মেয়র আওলাদ হোসেন দিলু মুখে উঠে আসে ওইসব সড়ক ও ড্রেনের বেহাল অবস্থার কথা।

বাজেট বক্তব্যে বরিশাল মহানগরের প্রায় সব রাস্তা ক্ষতিগ্রস্থ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই মাস মেয়র না থাকায় আমি ওইসব রাস্তা সংস্কার করেছি। তিনি এও বলেন, ময়লা-আবর্জনা অপসারনে ট্রাক দীর্ঘদিন অচল হওয়ায় অন্য ট্রাক ভাড়া করে আবর্জনা পরিস্কার করারর পাশাপাশি কর্পোরেশনের অচল ভ্যান, বক্স ভ্যান, ট্রলি ও ট্রক মেরামত করেছি। এরপর দিলু দ্বিতীয়বারের মত ২০০৮ সালের ১০ জুলাই বাজেট ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচিত হয়ে আসেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রয়াত শওকত হেসেন হিরন।

আ.লীগ (শওকত হোসেন হিরন): ২০০৯ সালের ১০ জুলাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৭২,৭৭,৭৫,৯৭৯ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট এবং ২০০৮-০৯ সালের ৭২,২৩,২২,৯২২ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন। তার প্রথম বাজেট বক্তব্যে ইতিমধ্যে তিনি বেশ কিছু উন্নয় পরিকল্পনার বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে নগরীর উন্নয়নে আরো কিছু পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলেন। এছাড়া নগরীকে আলোকিত ও ময়লা ভাগার, ফুটপাতের দখলদার মুক্ত করাসহ মডেল নগরী গড়ার ঘোষণা দেন। বছর শেষে বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ১০১ কোটি ২১ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার ৩৭.১০%।

(২০১০-২০১১): শওকত হোসেন হিরন দ্বিতীয়বারের মত ২০১০ সালের ১৪ জুলাই বাজেট নিয়ে আসেন। ২০১০-১১ অর্থবছরের জন্য ১৯৭,৭২,৩৫,৭৮৪ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য ১০১,২১,৪১,২০২ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন। এবার বাজেট বক্তব্যের শুরুতেই গত বাজেটে প্রতিশ্র“তির মধ্যে তিনি ১৯ টির অগ্রগতির সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন। এছাড়া আরো ৬ টি পরিকল্না গ্রহণ করার পাশাপাশি আরো ৬ টি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গিকার করেন। পাশাপাশি নানা উন্নয় পরিকল্পনা শেষ ও গ্রহণের কথা তুলে ধরেন। বছর শেষে বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ১০৫ কোটি ৫৬ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার ৫৩.৩৯%।

(২০১১-২০১২): তৃতীয়বারের মত ২০১১ সালের ১৪ জুলাই বাজেট নিয়ে হাজির হন শওকত হোসেন হিরন। ২০১১-১২ অর্থবছরেন জন্য ২৫৩,৯৫,৯২,৪১৮ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট এবং ২০১০-১১ সালের জন্য ১০৫,৫৬,১৮,৮০৬ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন। বাজেট বক্তব্যে প্রথমবারের মত উঠে আসে আধুনিক সুবিধাসম্বলিত অডিটরিয়াম, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন, পাইপলাইন নির্মান, হরিজনদের উন্নত বাসস্থান নির্মান, বিভিন্ন মার্কেট, বিবির পুকুর পাড় দখল মুক্ত করে সৌন্দর্য বর্ধন, সেখানে ওয়াইফাই জোন নির্মান, নগরীরর বিভিন্ন স্থানে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মান, শিশু পার্ক, সড়কে সৌন্দর্যবৃদ্ধি সহ নগরীতে বেশকিছু উল্লেযোগ্য উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় ধরনের অগ্রগতির কথা। বছর শেষে বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ১১১ কোটি ৪৪ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ৪৩.৮৮%। এখন পর্যন্ত এটাই বিসিসির তিন মেয়রের মধ্যে সেরা বাজেট বাস্তবায়।

(২০১২-২০১৩): ২০১২ সালের ৩০ জুন চতুর্থ ও শেষ বাজেট ঘোষণা করেন শওকত হোসেন হিরন। ২০১২-১৩ অর্থবছরের জন্য ৩২২,২৪,৮৪,৯৯২ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট এবং ২০১১-১২ সালের জন্য ১১১,৪৪,৩৬,৪৩৮ টাকার সংশোধিত বাজেট ঘোষণা করেন তিনি। বাজেট বক্তব্যে তিনি নগরীর বিভিন্ন স্থানে আশানুরুপ উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া নগরীর রাস্তা-ঘাট উন্নতি, ট্রেনেজ ব্যাবস্থা, ফুটপাত নির্মান, মার্কেট নির্মান, খাল উদ্ধারে কার্যক্রমসহ একটি আধুনিক নগরী বাস্তবায়নে নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ড শেষ ও চলামানের কথা উল্লেখ করে আরো বিশদ পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলেন। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ২২১ কোটি ৩৫ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ৩৭.৬৬%। পশাপাশি তার বহুমুখী নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে একটি বাস যোগ্য আধুনিক মডেল শহরের রুপান্তরে দ্বাড় প্রন্তে পৌছান শওকত হোসেন হিরন।

পরে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেন। কারণ এ বছর বিএনপির মেয়র আহসান হাবিব কামাল নির্বাচিত হলেও শপথ নিতে দেড়ি হয়। তবে ওই বাজেট বাস্তবায়ন করেন বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামাল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৩৮১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন হয় ১৪২ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা। বাস্তবায়নের হার ৩৭.৩৩%।

উল্লেখ্য, বরিশাল সিটির নগর পিতা হিসেবে বিএনপি সমর্থী মেয়র আহসান হাবীব কামাল ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেটে ১৮২ কোটি টাকার সর্বোচ্চ উন্নয়ন প্রকল্প (কাগজে-কলমে) বাস্তবায়ন করেন তিনি। এরপরেও তার মেয়াদে বকেয়া-বেতনের দাবিতে দীর্ঘদিন সিটি কর্পোরেশন অচল থাকাসহ নগরীর বেহাল সড়ক, জলাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত আলোসহ বেশিভাগ নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল নগরবাসী।

বিএনপি (আহসান আবিব কামাল ২০১৪-২০১৫) : ১০১৪ সালের ২২ জুলাই প্রথমবারের মত বাজেট নিয়ে আসেন বিএনপির মেয়র আহসান হাবিব কামাল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ওই বাজেটে ৪০৭,৮৮,৯৪,৯৭৫ টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। বাজেট বক্তব্যে নিজের কিছু উন্নয়ন কাজ করার কথা উল্লেখ করে আরো কিছু উন্নয়ন কাজের আশ্বাস দেন তিনি। একই সাথে জলাবদ্ধাতা নিরসনের কথা বলেন। এছাড়া আরো ৮টি প্রকল্প নেওয়ার কথা জানান। বছর শেষে বাস্তবায়িত হয় প্রায় ১৪৭ কোটি ৪৭ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ৩৬.১৫%।

(২০১৫-২০১৬): ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই ৪২৩,২১,৬৪,৫৫৬ টাকার বাজেট ঘোষাণা করেন কামাল। বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন, সৌন্দর্য বর্ধন, দারিদ্র কমানো, বিপনন সুবিধা, জলাবদ্ধতা দূরকরণ, জনস্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বৃদ্ধাশ্রম, প্রতিবন্ধী ফাইন্ডেশন, কর্মজীবী হোস্টেল নির্মান, পথশিশু আশ্রায়ন, হিজরাদের পুনবাসন, কমিউনিটি সেন্টার নির্মান, ফটু ওভার ব্রিজ সহ বেশ বড়সর উন্নয়ন প্রকল্পসহ ৯টি প্রকল্প গ্রহণের কথা তুলে ধরেন। বাজেটের বছর শেষে বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ১৮২ কোটি ৭৪ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ৪৩.১৮%।

(২০১৬-২০১৭): তৃতীয়বারের মত ২০১৬ সালের ১৭ আগষ্ট বাজেট নিয়ে হাজির হন কামাল। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের ওই বাজেটের আকার ছিল ৪৪৪,১০,৫৮,৭৬৫ টাকা। বাজেট বক্তব্যে উন্নয়নে গ্রিণ সিটি পার্ক নির্মনের কথা উল্লেখ করেন। তবে তা বছর ঘুরতেই অচল হয়ে পড়ে। এছাড়া বাজেট বক্তব্যে বেশকিছু উন্নয়নয় তুলে ধরে আগের বারের মত এবারেও উন্নয়নে বৃহৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। বছর শেষে বাস্তবায়ীত হয় প্রায় ১৫১ কোটি ৭৫ লক্ষা টাকা মাত্র। বাস্তবায়নের হার শতকরা হিসাবে যা ছিল ৩৪.১৭%।

(২০১৭-২০১৮): ২০১৭ সালের ১৭ আগষ্ট চতুর্থবারের মত বাজেট ঘোষণা করেন কামাল। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ ওই বাজেটে ৪০৬,৪৫,৮০,০২৮ টাকা বরাদ্ধার কথা ঘোষণা করেন। বাজেটে কয়েকটি প্রকল্প শেষের কথা উল্লেখ করে বরাবরের মত এবারেও তিনি ডজন খানেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি সরোয়ারের মত তিনিও বেমালুন ভুলে যান প্রথমসহ পর পর কয়েকটি বাজেটে দেয়া নানা প্রতিশ্রুতির কথা। তবে পরবর্তী বাজেট ঘোষণা না দেয়ার কারণে এই অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়িত ও শতকরা হিসাব পাওয়া যায়নি।

সূত্র: দৈনিক বরিশাল অঞ্চল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত