বিকল্পধারার ইশতেহার ঘোষণা

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:৫৬

জাগরণীয়া ডেস্ক

 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছে মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত দল বিকল্পধারা বাংলাদেশ।

২৪ ডিসেম্বর (সোমবার) দুপুরে রাজধানীর হোটেল লেকশোরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ইশতেহার ঘোষণা করেন।

এ সময় বহুল আলোচিত ভারসাম্য প্রসঙ্গে বিকল্প ধারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মন্ত্রিসভায় ভারসাম্য আনা হবে।

‘উন্নয়ন হোক তোমার হৃৎপিণ্ড, গণতন্ত্র হোক তোমার আত্মা- জেগে ওঠো দুর্বার বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্লোগানে ইশতেহার প্রণয়ন করে বিকল্পধারা। অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিকল্পধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহী বি চৌধুরীসহ বিকল্পধারা ও যুক্তফ্রন্টের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

ইশতেহারে দেশের সামগ্রিক পরিবর্তনে বেশকিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে-

ক) আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার
(১) জাতীয় সংসদকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা।
(২) জাতীয় সংসদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
(৩) দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন করা।
(৪) সংবিধানের ৭০ (সত্তর) অনুচ্ছেদ সংস্কার করা।
(৫) প্রাদেশিক সরকার ও আইনসভা গঠন।
(৬) প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য সৃষ্টি করার বিষয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা করা।
(৭) নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে সংসদে আলোচনা করা।
(৮) সংবিধানে উল্লেখিত ন্যায়পাল-এর পদটি গঠন ও কার্যকর করা।
(৯) ন্যায়ভিত্তিক আইনের শাসনের মাধ্যমে সামাজিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা।
(১০) পুলিশ ও অন্যান্য শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিশেষ কর্মসূচি প্রণয়ন করা।

খ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি
(১) গ্রামীণ শিল্পোন্নয়ন ও অন্যান্য কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণ।
(২) সকল জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণ।
(৩) দেশের সকল নাগরিকের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা।
(৪) সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতিকে নির্মূল করা।
(৫) বেসরকারি খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চতম সুযোগ নিশ্চিত করা।
(৬) শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন এবং অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে সরকারের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।
(৭) শ্রমিকের ন্যায়সংগত দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে শ্রম আইন সংস্কার এবং বিশেষ করে মহিলা শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য ও বাসস্থান সুবিধা বৃদ্ধি করা।
(৮) নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যথাযথ আইন প্রণয়ন এবং সড়কের সুবিধাদি নিশ্চিতকরণ।
(৯) ব্যাংকিং কমিশন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন।
(১০) একটি ‘যুব কমিশন’ গঠন ও কমিশনের মাধ্যমে যুব প্রতিনিধিদের দ্বারা ভবিষ্যতে যুবশক্তির উন্নয়ন এবং যুব স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
(১১) মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক কর্মকাÐে সুযোগ ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বৃদ্ধিকরণ।
(১২) শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সমাজে ও সরকারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সক্ষম প্রতিবন্ধীদের সরকারে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় চাকরি সংরক্ষণ করা।
(১৩) সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধিকরণ এবং অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ বছরে উন্নীতকরণ।
(১৪) মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চালু রাখা।
(১৫) সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও নিশ্চিতকরণ।
(১৬) পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তরাঞ্চল, নদীভাঙ্গা এবং চরাঞ্চলের চরম দারিদ্রপীড়িত জনগণের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ।
(১৭) নারীদের আর্থিক উন্নয়নে পৃথক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
(১৮) সকল ধর্মীয় ও অনুভূতির প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান, সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ সৃষ্টি।
(১৯) দেশ ও জাতির কল্যাণে জঙ্গিবাদ এবং চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চালু রাখার দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দেশ থেকে সব ধরণের সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ।
(২০) গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি বিভাগ সহ অন্যান্য নাগরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সেবা গ্রহণে অযথা হয়রানি বন্ধকরণ এবং যথাযথ সেবা নিশ্চিতকরণ। দ্রব্যমূল্য ও সরকারি বিলসমূহ সহনশীল পর্যায়ে রাখা।
(২১) ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্ত, যেমন - পাট উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র সমবায় ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস শ্রমিক এবং মোবাইল ব্যাংকিং ও রিচার্জ ব্যবসায়ীদের আর্থিক উন্নয়ন স্বার্থে পৃথক পৃথক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা।

গ) কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়ন
(১)কৃষকের অবস্থার সার্বিক উন্নয়নে বাস্তবমুখি কৃষক-বান্ধব নীতি ও আইনের প্রবর্তন এবং প্রয়োগ করা।
(২) কৃষি পণ্যের উৎপাদনে সরকারি সহায়তা, ভর্তূকি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
(৩) পৃথক ‘পাট মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করা।
(৪) জাতীয় মাথাপিছু আয়ের নিচে যাদের অবস্থান থাকবে সেইসব কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের ৬০ বছর বয়সের পর থেকে তাদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকারি পেনশনের ব্যবস্থাকরণ।

ঘ) শিক্ষা ব্যবস্থা
বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও যুক্তফ্রন্ট শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে চায়-
(১) গ্রাম ও শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক পার্থক্য তথা বৈষম্য দূরীকরণ।
(২) কঠোর ভাবে প্রশ্নফাঁস সহ শিক্ষার সকল দুর্নীতি দমন।
(৩) দেশ পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে প্রত্যেক জেলাতে একটি করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা।
(৪) জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিকরণ ও উচ্চতম মানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক তৈরিতে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান। প্রয়োজনে শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করণ।
(৫) ভুক্তি প্রক্রিয়া সহজীকরণ।
(৬) বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় সাধন ও মান নিয়ন্ত্রণ।

ঙ) গণতন্ত্র ও ভারসাম্যের রাজনীতি
(১) ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চিতকরণ।
(২) সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতা।
(৩) ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংস্কার।
(৪) জীবনের নিরাপত্তা প্রদান।
(৫) মন্ত্রিসভায় কমপক্ষে ২০ শতাংশ মহিলাদের এবং ২০ শতাংশ দেশের বিশেষজ্ঞদের (টেকনোক্রেট) জন্য সংরক্ষণ।
(৬) সংবিধানে উল্লেখিত সকল মৌলিক অধিকার নির্বিঘ্নে ভোগের সুযোগ।
(৭) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তাঙ্গনের ন্যায় বৃহত্তর পরিসরে উন্মূক্ত সভা-সমাবেশের জন্য স্থান নির্ধারণ।
(৮) বিরোধী দলের সংসদের প্রতিনিধি থেকে ১ জন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন।
(৯) শ্রমজীবী, কৃষক ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিকে বাধ্যতামূলকভাবে মন্ত্রিসভায় স্থান দিতে হবে।

চ) পরিবেশ
জলবায়ু ও পরিবেশের প্রতি সারা বিশ্বে যে হুমকি দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ সে হুমকির বাইরে নয়। সেজন্য এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন টেক্নোক্রেট মন্ত্রী নিয়োগ দিতে হবে। ভবিষৎ ক্ষতি মোকাবেলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

ছ) নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা
(১) আধুনিক, পেশাদার এবং দেশপ্রেমিক দক্ষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করা।
(২) মানবতা বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য অব্যাহত রাখা।
(৩) সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

জ) পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতি
(১) বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও যুক্তফ্রন্ট বিশ্বাস করে যে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, বাস্তবমুখী, পারস্পরিক লাভ ও সম্মান এবং দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে।
(২) প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক আরো শক্তিশালীকরণ। এ ছাড়া আমাদের বন্ধুপ্রতিম পশ্চিমা দেশসমূহের সঙ্গে আরো দৃঢ়তর সম্পর্ক স্থাপন।
(৩) আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সার্ক এবং বিমস্টেক-এর জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।
(৪) ইসলামী দেশসমূহ (ওআইসি) এবং কমনওয়েলথ এর সঙ্গে সম্পর্ক আরো নিকটতর করা।
(৫) ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একাত্মতা ও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা।
(৬) জাতিসংঘের নীতি এবং চার্টারের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থা জ্ঞাপন করা।
(৭) বাংলাদেশি পণ্য রফতানিকরণ এবং এ দেশের কর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কূটনীতি দৃঢ়করণ।
(৮) বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ।
(৯) আমাদের অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন দেশের সঙ্গে সড়ক, রেল, নদী ও আকাশ পথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা।

ইশতেহারের বিষয়ভিত্তিক ব্যখ্যায় বলা হয়েছে-
সংসদ কার্যকর করা: অতীতের অভজ্ঞিতা থেকে দেখা যায় যে, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংসদ বর্জন করার প্রবণতা ছিল। সময়ের সাথে সাথে এটি একটি অসুস্থ রাজনৈুিতক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল।

বিকল্পধারা বাংলাদেশ এই প্রবণতাকে অনৈতিক, নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধিদের অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতির বিরোধী বলে মনে করে। আমাদের আহ্বান, এই সংস্কৃতি নীতিগতভাবে পরিত্যাগ করা উচিত।

সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা উচিত। পররাষ্ট্র, অর্থ ও স্বরাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা উচিত।

সংসদ সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি: ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি। তখন জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা ৩০০ নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে ৩০টি আসন সংরক্ষিত ছিল মহিলাদের জন্য। মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩০।

২০১৮ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সেই তুলনায় সংসদের সদস্য সংখ্যা বাড়েনি। তবে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যায় ৫০ জন করা হয়েছে।

বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও যুক্তফ্রন্ট প্রস্তাব করছে সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৪৫০-এ বৃদ্ধি করতে হবে। এর ফলে জাতীয় সংসদ তুলনামূলকভাবে আরও বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক হবে।

এতে ভোটাররা সহজেই তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে যেতে পারবে। ৪৫০ জন সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে নারীদের জন্য ৭০টি আসন সংরক্ষিত থাকবে। প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যার মাধ্যমে বর্তমান ৩০০ আসনের পরিবর্তে ৪৫০ আসনের ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা পুনর্গঠন করা যেতে পারে। (উদাহরণ: যুক্তরাজ্যে ৬ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার জন্য হাউস অফ কমন্সে ৬৫০ জন সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হয়।)

দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা: বিকল্পধারা বাংলাদেশ প্রস্তাব করছে, ১০০ আসনবিশিষ্ট সংসদের একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলসমূহের মধ্য থেকে সংখ্যানুপাতে এই উচ্চকক্ষের সদস্যদের মনোনীত বা নির্বাচিত করা যেতে পারে। নিম্নকক্ষে কোনো বিল আইনে পরিণত করার আগে এখানে আলোচনার পরে ভোটে দেওয়ার ব্যবস্থার জন্য এই কক্ষকে ক্ষমতা দিতে হবে। এই আইনসভাকে রাষ্ট্রীয় সংসদ বলা যেতে পারে। (উদাহরণ: তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালেও এই ধরনে সংসদ কার্যকর রয়েছে।)

৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার: বাংলাদেশের সংবিধানের অধীনে ৭০ অনুচ্ছেদে একজন সংসদ সদস্যকে তাঁর স্বতন্ত্র বিবেচনার ভিত্তিতে কোন বিলে ভোট দিতে বাধা দেয়। একজন এমপি শুধুমাত্র দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। যদি কোনো এমপি ভিন্নভাবে ভোট দিতে চান তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সদস্যপদ হারাতে পারেন। এই পদ্ধতিটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অন্তরায়। তাই বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও যুক্তফ্রন্ট প্রস্তাব করছে ৭০ অনুচ্ছেদটি আরও গণতান্ত্রিক করতে সংশোধন করা হোক। সংশোধিত ৭০ অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদেরকে কোনো অর্থ বিলের ক্ষেত্রে এবং সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ব্যতীত তার বিবেচনার ভিত্তিতে অন্য বিলে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেবে।

প্রাদেশিক সরকার সৃষ্টি: স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্মের মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশ একটি এক-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এর অর্থ এই যে সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে ন্যস্ত করা হয়।

উপজেলা ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ যথেষ্ট নয়। বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও যুক্তফ্রন্ট প্রস্তাব করছে যে কয়েকটি প্রাদেশিক সরকার গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনের জন্য সকল অংশীদারদের মধ্যে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। ঔ প্রদেশের জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত সংসদ হবে। উপযুক্ত আইনী, প্রশাসনিক, বিচারিক এবং আর্থিক ক্ষমতা নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারগুলোকে প্রদান করা হবে।

(উদাহরণ: শ্রীলঙ্কার ২ কোটি ৩০ লক্ষ জনসংখ্যা এবং বাংলাদেশের তুলনায় ছোট আকারের ফেডারেল রাষ্ট্র। দেশটি ৮টি প্রদেশে বিভক্ত, যা নির্বাচিত প্রাদেশিক কাউন্সিল দ্বারা পরিচালিত হয়)।

উন্নয়ন গণতন্ত্র ও সুশাসন: উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আজকে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে গতিধারা সৃষ্টি হয়েছে তা অব্যাহত রাখতেই হবে। সারা পৃথিবী অবাক বিষ্ময়ে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। দুর্নীতি ও অদক্ষতা দূর করতে পারলে আমাদের জিডিপি শতকরা আরও ২ থেকে ৩ ভাগ বাড়ানো সম্ভব। সমাজ ও সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে সুশাসনের জন্য দূর্নীতিমুক্ত এবং দক্ষ প্রশাসন তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সংঙ্গে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করতে পারলে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না।

ভারসাম্যের রাজনীতি: শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে আমরা ভারসাম্যের কথা বলিনি; এখনও বলি না। ভারসাম্য প্রধানমন্ত্রী একং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। ভারসাম্য মন্ত্রিসভায়ও আনতে হবে (বিশেষজ্ঞ বিভাগগুলোতে টেকনোক্রেট নিযুক্তির সাহায্যে) এবং মন্ত্রিসভায় মহিলাদের সংখ্যা শতকরা ২০ ভাগ উন্নতি করে, কৃষক-শ্রমিক ও যুবশক্তি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে মন্ত্রিসভায় ভারসাম্য আনা যেতে পারে।

ছাত্র ও শিক্ষা ব্যবস্থা: শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওইসব ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন করতে হবে এবং তা সম্ভব। যেমন:

(ক) শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তব ও উপার্জনমুখী করতে হবে। একই সঙ্গে চরিত্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে। দেশপ্রেম ও মানবতাবাদ শিক্ষার অংশ হতে হবে । প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্নীতির মূল উৎপাটন করতে হবে। গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার পার্থক্য ও বৈষম্য দূর করতে হবে। গ্রামের সেরা শিক্ষক নির্বাচনের পদ্ধতি বের করতে হবে এবং তাদের জন্য বাৎসরিক বোনাস দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাইভেট শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয়ভার সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

যুবকদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা: আমাদের যুব সমাজ অনেক অগ্রগামী চিন্তার ধারক ও বাহক। তারা ডিজিটাল যুগের মানুষ। দেশ পরিচালনায় তাদের চিন্তাধারার যথাযোগ্য মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেহেতু বিকল্পধারা ও যুক্তফ্রন্ট বিশ্বাস করে যে, একটি ‘যুব কমিশন’ এর মাধ্যমে একটি ‘যুব কাউন্সিল’ গঠন করা যেতে পারে। তাদের মাধ্যমে যুবশক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারে যুব প্রতিনিধিদের সুপারিশসমূহকে বিবেচনা করতে হবে।

জনগণের মৌলিক দাবি: সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক দাবিগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি অব্যাহত আছে। কিন্তু এগুলো আরো সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন এবং সুশাসনের সাথে এগুলো ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। রোগ চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধ করার বিষয় অনেক বেশি জোর দিতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে চিকিৎসক এবং রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। প্রচলিত ওষুধ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ক্যান্সার, হাইপ্রেসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগ জ্যামেতিক হারে বেড়েছে। এই রোগসমূহের প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য ও সস্তা করতে হবে।

সকল প্রকার খাদ্য ও পানীয় সম্পুূর্ণভাবে ভেজাল মুক্ত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায় রাষ্ট্রের কমিটমেন্ট বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজনে কঠোর দণ্ডের বিধান করতে হবে।

কৃষক, শ্রমজীবী ও প্রবাসী: এরা হলেন সমাজের আসল মেরুদণ্ড। উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এরাই হলেন সবচেয়ে বড় অংশীদার। অথচ তাদের এই অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারি নাই। দেশে ও বিদেশে আমাদের সমস্ত শ্রমিক কঠোর শ্রমের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য তাদের সঠিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেয়া প্রয়োজন। কৃষক ও প্রবাসী শ্রমিকের অনিয়মিত উপার্জন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিবিধান করতেই হবে। সেজন্যই বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও যুক্তফ্রন্ট ৬০ ঊর্দ্ধ কৃষক যাদের আয় জাতীয় মাথাপিছু আয়ের চেয়ে কম তাদের সরকারি পেনশনের ব্যবস্থার প্রস্তাব করছে।

ক্ষুদ্র নৃ-গোণ্ঠি এবং দারিদ্রপিড়ীত মঙ্গাঞ্চল: বাংলাদেশের একটি লজ্জা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ও দারিদ্র পিড়ীত মঙ্গাঞ্চলের জনগণের আর্থিক অবস্থা সাধারণ বাংলাদেশের মানুষের তুলনায় অনেক নিম্নে। এই অবস্থার আশু পরিবর্তন প্রয়োজন। তাদের অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে।

আপনারা জানেন আমরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর সাথে নির্বাচনি ঐক্য করেছি। আমাদের জোটের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা এবং আওয়ামী লীগের সম্মতিক্রমে দলীয় নির্বাচন প্রতীক কুলাতেও নির্বাচন করছি।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে। ইশতেহারের বক্তব্যগুলোতে দেশপ্রেম এবং ব্যাপক উন্নয়নের সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। আমরা আমাদের মিত্র দলকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। যে স্বপ্ন বান্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ রক্তদান করেছে, শহীদ হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এবং দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। এদের রক্ত, ঘাম, অশ্রু কখনও বৃথা যেতে দেয়া যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন আমাদের এই নির্বাচনি ইশতেহারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমাজ পরিবর্তনমূলক প্রস্তাবনা রয়েছে। যেগুলো আমরা প্রধানমন্ত্রীকে এবং জাতীয় সংসদে দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করবো, দাবি করবো। এর মাধ্যমে ইনশাআল্লাহ আমাদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য “একটি শান্তি সুখের বাংলাদেশ”-এ পৌঁছাতে পারবো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত