একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নির্বাচনী ইশতেহার

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:৫৩

জাগরণীয়া ডেস্ক

ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১

ভূমিকা 
এ দেশের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত জনগণের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠালগ্নে সংগ্রামী জনগণ যে ধরনের বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বিবৃত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ৭২’র সংবিধানের চার মূলনীতি-জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে। সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি, তা বাস্তবায়নই আমাদের অঙ্গীকার। তাকেই আমরা নাম দিয়েছি ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’। এই ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’-এর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সময়ের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় তার নবায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর গত ২৮ বছরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক বৃত্তের মধ্যে দেশকে আটকে ফেলা হয়েছে। এই দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক কাঠামো দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী তো করতে পারেইনি, বরং যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা ক্রমান্বয়ে আরও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ারগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও গণতন্ত্র হয়েছে সংকুচিত।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের ধারার বিপরীতে দেশে লুটপাটতন্ত্রের ধারা শক্তিশালী হয়েছে। লুটপাটের ভাগবাঁটোয়ারা করতে এবং জনগণের সম্পদ পকেটস্থ করার অভিপ্রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে মরিয়া এই দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের মূল দ্বন্দ্ব হলো এই ‘এক ভাগ’ লুটপাটকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘নিরানব্বই ভাগ’ জনগণের স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অথচ এই মৌলিক দ্বন্দ্বকে আড়াল করতে ওই ‘এক ভাগ’-এর স্বার্থরক্ষাকারী দুটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে দেশের জনগণের সামনে প্রধান দ্বন্দ্ব হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। এই দুটি রাজনৈতিক দল একে অপরের বিকল্প নয়-তারা আসলে একই পক্ষের, তথা সমাজের এক আনা লুটেরা শোষকদের স্বার্থরক্ষাকারী পক্ষের দুটি প্রধান বিবাদমান গোষ্ঠী।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) প্রতিটি মানুষের শ্রম, মেধা, কর্মক্ষমতার দক্ষ ও সৃজনশীল বিকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোর সার্বিক উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটাতে চায়। গণতন্ত্রকে খর্ব করে ‘এক ভাগ’ মানুষের পকেট ভরার উন্নয়ন নয়, বরং গণতন্ত্রকে নিরঙ্কুশভাবে কার্যকর করেই সিপিবি ‘নিরানব্বই ভাগ’ মানুষের শ্রমে ও ঘামে অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফলকে ‘নিরানব্বই ভাগ’ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সংগ্রামরত।

এই পরিপ্রেক্ষিতে, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোয় বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করতে, বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি-সমাবেশ গড়ে তুলে সিপিবি দেশে একটি বাম-গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবর্তন আজ শুধু অপরিহার্যই নয়, পরিবর্তন আজ সম্ভব। গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান, সাম্প্রতিক কিশোর বিদ্রোহ ইত্যাদির ভেতর দিয়ে তার প্রামাণ্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। সিপিবি সেই নতুনের কেতন, তারুণ্যের সেই প্রাণতরঙ্গকে ধারণ করে দেশকে ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ ও অপরাপর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে একযোগে কাজ করে সিপিবি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে।

জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, বর্তমানে দেশ ও জনগণের প্রধান চার বিপদ ‘লুটপাটতন্ত্র, গণতন্ত্রহীনতা, সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’কে পরাস্ত করতে সিপিবি চলমান আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী সংগ্রামে শামিল হয়েছে ‘কাস্তে’ মার্কা নিয়ে। ‘কাস্তে’ মার্কার প্রতিটি ভোট দ্বি-দলীয় ধারার লুটপাটতন্ত্রের কফিনে একেকটি পেরেক ঠুকবে। লুটপাটের ধারার বিপরীতে আমাদের বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘কাস্তে’ মার্কায় ভোট প্রদান করে সিপিবি’র প্রার্থীদের এবং সেইসঙ্গে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’-এর অন্য প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই। 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’কে সঙ্গে নিয়ে ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’-এর আলোকে নিম্নলিখিত ৩০ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে-

১) মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংবিধান, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাজনীতির সংস্কার সাধন
ক. রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি তথা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে বিদ্যমান সংবিধানের সাংঘর্ষিক সব বিধিবিধান বাতিল করা। 
খ. নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বিপদ পরিহার করার জন্য যৌথতা ও জবাবদিহিতার বিধান আরও স্পষ্ট করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। বহুদলীয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। 
গ. প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার প্রসার এবং একইসঙ্গে বাংলাদেশের আদিবাসী গোষ্ঠী ও অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষের অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও বিকাশের অধিকার রক্ষা করা।
ঘ. অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানকে জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা এবং তা রাষ্ট্র কর্তৃক পূরণের আইনি বাধ্যবাধকতার বিধান প্রণয়ন করে বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ঙ. ধর্ম, বর্ণ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমূলক সব আইন ও বিধি বিলোপ করা। 
চ. দল-মত নির্বিশেষে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অব্যাহত রাখা। স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার বিধান সংবিধানে ফিরিয়ে এনে তা বাস্তবায়ন করা।
ছ. নাগরিকদের স্ব স্ব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রচারণা নিষিদ্ধ করা। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করা।
জ. বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা এবং বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
ঝ. দেশ রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে সব সক্ষম তরুণকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থাসহ যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করা। দেশের প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের কাজ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সব কার্যক্রম জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করা। 
ঞ. সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার করা। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ইত্যাদিসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা। 

২) মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
ক. ব্যক্তি-স্বাধীনতা, বাক্-স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, ধর্মঘট করার স্বাধীনতা, সমাবেশ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। 
খ. মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি আইনসমূহ বাতিল করা। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার সনদ অনুসরণ করা এবং তার যেকোনো লঙ্ঘন রোধ করা।
গ. ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’সহ মৌলিক অধিকার খর্বকারী সব নিবর্তনমূলক কালা-কানুন বাতিল করা। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার করে গণ-প্রচারমাধ্যমসমূহের ওপর জনগণের কার্যকর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বেতার-টিভিকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

৩) গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন 
ক. রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক কাঠামোকে (১) উপযুক্ত গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ, (২) স্বচ্ছতা, (৩) জবাবদিহিতা, (৪) জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ-এসব মূলনীতির ভিত্তিতে মৌলিকভাবে ঢেলে সাজানো।
খ. জাতীয় সংসদ সদস্যদের পরিবর্তে নির্বাচিত স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার হাতে স্ব স্ব স্তরের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করা। 
গ. সংসদ সদস্যদের ওপর স্থানীয় বিষয়ে তদারকির কাজ আরোপ না করে একনিষ্ঠতা ও দক্ষতার সঙ্গে কেবল রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের তদারকির কাজ তাঁদের ওপর ন্যস্ত করা। 
ঘ. স্থানীয় সংস্থার জন্য রাষ্ট্রীয় বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ সংবিধিবদ্ধভাবে বরাদ্দ রাখার বিধান করা।
ঙ. স্থানীয় সরকারের সব স্তর ও কাঠামোতে পর্যায়ক্রমে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদসহ সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা।

৪) নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা 
ক. নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে সংবিধানের ১১৮(১) ধারা মোতাবেক প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ‘রুটিন কাজ’-এর জন্য ‘নির্বাচনকালীন সরকার’-এর বিধান সংবিধানে যুক্ত করা। 
খ. সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুসহ সিপিবি’র ৫৩-দফা সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা। 
গ. জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সব স্তরের নির্বাচনকে অর্থ, পেশিশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, ক্ষমতাসীন সরকার ও প্রশাসনের নানা কারসাজির প্রভাব থেকে মুক্ত করা।
ঘ. ‘না’ ভোট প্রদানের বিধান চালু করা।
ঙ. জনগণের কাছে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ভোটার কর্তৃক যেকোনো সময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার এবং পুননির্বাচনের অধিকার ও ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
চ. যুদ্ধাপরাধী ও ঋণখেলাপিদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা। 
ছ. মেহনতি ও দরিদ্র প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বাধাসমূহ দূর করা। পর্যায়ক্রমে সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারণা কাজ সরকারি অর্থে ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা। 

৫) বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থাপনা
ক. উৎপাদনশক্তির বিকাশের স্বার্থে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে রাষ্ট্রীয়, সমবায়, ব্যক্তি এবং অন্যান্য মিশ্র খাতকে সহায়তা প্রদান করা।
খ. জাতীয় অর্থনীতি বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং তার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক ও স্থানীয়ভিত্তিক পরিকল্পনা করে নিচ থেকে উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারা এগিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা। সব পর্যায়ের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা প্রণয়ন, সম্পদ সংগ্রহ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের, বিশেষত সংশ্লিষ্ট উৎপাদক, কর্মীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে অনগ্রসর এলাকা এবং প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ রাখা। 
গ. টেকসই উন্নয়ন-কৌশল নির্ধারণ করা। ঢালাও বিরাষ্ট্রীয়করণ, বিনিয়ন্ত্রণ, উদারীকরণের আত্মঘাতী নীতি পরিত্যাগ করা। রাষ্ট্রীয় কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ, উন্নত ও লাভজনক করার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রাষ্ট্রীয় খাতকে নিয়ামক রেখে একইসঙ্গে ব্যক্তিখাতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের শিল্প-ব্যবসার পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং রাষ্ট্র কর্তৃক তাঁদের যৌক্তিক সহায়তা প্রদান করা। 
ঘ. পুঁজিবাদী বিশ্বায়নে বিশ্ববাজারের অসম প্রতিযোগিতার মুখে জাতীয় শিল্প-কারখানার স্বার্থরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদানের নীতি অনুসরণ করা। 
ঙ. জাতীয় অর্থনীতি ও দেশীয় শিল্প বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে-এমন বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ বন্ধ করা। বহুজাতিক সংস্থা ও বিদেশি পুঁজির জাতীয় স্বার্থবিরোধী অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।
চ. শিল্পের ক্ষেত্রে প্রথম অবস্থায় শ্রমঘন প্রযুক্তি ব্যবহারসহ লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা। তথ্য-প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজিসহ আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করা এবং জাতীয়ভাবে এসবের ব্যবহারের ভিত্তি গড়ে তোলা। 
ছ. জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের ব্যয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে মোটা দাগে এক-তৃতীয়াংশ অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সামাজিক কার্যক্রমের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে সরাসরি বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট রাখা।
জ. দেশের বিত্তবানদের জন্য কর রেয়াত বন্ধ করে, তাদের ওপর প্রত্যক্ষ করের হার বৃদ্ধি ও বাজেটে সাধারণ জনগণের ওপর আরোপিত পরোক্ষ করের অনুপাত হ্রাস করা।
ঝ. প্রবাসীদের সুশিক্ষিত করে বর্ধিত উপার্জনকে দেশে বিনিয়োগ করার জন্য প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রবাসীদের সহায়তার জন্য বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম আরও দক্ষ ও বর্ধিত করা। নদী ভাঙনের শিকার ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশার স্থায়ী নিরসনে বিশেষ সেল গঠন করা।
ঞ. শিল্পের বহুমুখীকরণ করা। সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে অনগ্রসর এলাকা এবং প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ রাখা। 
ট. প্রকৃত সমতার ভিত্তিতে ‘নয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার জন্য সমস্বার্থসম্পন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করা। তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোর মধ্যে সমমর্যাদা ও সমস্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্য, সংহতি ও সহযোগিতা জোরদার করার জন্য সচেষ্ট থাকা। 
ঠ. গণতান্ত্রিক বিশ্বায়নের আওতায় শ্রমের অবাধ চলাচলের দাবিতে বিশ্বব্যাপী যে সংগ্রাম চলছে, তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া।
ড. সামরিক খাত ও মাথাভারী প্রশাসনসহ সব অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বরাদ্দ যুক্তিসংগত পরিমাণে সমন্বিত করা। 
ঢ. বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সরকার ও সেবাগ্রহীতাদের কাছে এনজিও পরিচালকমণ্ডলীর জবাবদিহিতা কার্যকর করা।

৬) কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস
ক. ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেই ভিত্তিতে দেশের শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ইত্যাদি নীতি রচনা করা। 
খ. সমবায় ও ব্যক্তিমালিকানা খাতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কার্যকর ও অর্থবহ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কর্মক্ষম সব মানুষের জন্য ক্রমান্বয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে নিয়মিতভাবে দেশের সর্বত্র সারাবছর ‘কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা স্কিম’ চালু করা। প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের কাজ পাওয়ার অধিকারকে সাংবিধানিক অধিকারে পরিণত করা। আগামী ৫ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। 
গ. দরিদ্র, অনাহারি, বেকার, অসহায় মানুষের জন্য ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানসম্পদের সার্বিক বিকাশ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণসহ ব্যাপক কার্যক্রম অগ্রাধিকারমূলকভাবে গ্রহণ করা। এই খাতে সমন্বিত বাজেট বরাদ্দ সর্বাধিক করা, সামাজিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বিদ্যমান বৈষম্য ক্রমান্বয়ে দূর করার প্রক্রিয়া শুরু করা। সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা সৃষ্টি করা। 
ঘ. জাতীয়ভাবে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদিত হচ্ছে বা উৎপাদন করা সম্ভব এ ধরনের পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা। দেশের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য একান্তভাবে প্রয়োজনীয় নয়, এমন পণ্যের ও বিলাসদ্রব্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা। ভোগবাদী প্রবণতা রোধ ও মিতব্যয়িতার ধারায় জাতীয় বিকাশের আন্দোলন সৃষ্টি এবং ক্ষেত্রবিশেষে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।

৭) ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা
ক. সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চস্তরসহ সর্বস্তর থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ‘ন্যায়পাল ব্যবস্থা’ চালু করা। স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’-এর শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। ঘুষ-দুর্নীতি ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
খ. রাষ্ট্র ও বিভিন্ন সংস্থার উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এবং দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা।
গ. বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 
ঘ. ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করাসহ খেলাপিঋণ উদ্ধারে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া। ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে দুর্নীতি-অনিয়ম রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা। বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ‘কালো টাকা সাদা করা’র নীতি পরিহার করা এবং কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করা। 
ঙ. ঘুষ ছাড়া চাকরি নিশ্চিত করা। নিয়োগ বাণিজ্য, প্রমোশন বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, পার্সেন্টেজ বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য ইত্যাদি কঠোরভাবে রোধ করা।

৮) দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ 
ক. দেশব্যাপী দক্ষ ও শক্তিশালী গণবণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। গরিব মানুষের জন্য স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা। ‘টিসিবি’ ও ‘বিএডিসি’কে সক্রিয় করা। সর্বত্র ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সরকারি ‘বাফার স্টক’ গড়ে তোলা। ‘টেস্ট রিলিফ’ চালু করা। 
খ. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘উৎপাদক সমবায়’ ও ‘ক্রেতা সমবায়’ গঠন করে তাঁদের মধ্যে সরাসরি কেনা-বেচার ব্যবস্থা চালু করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত মুনাফাবাজি খর্ব করা। 
গ. বাজার-সিন্ডিকেটের অপরাধ চক্র সমূলে উৎপাটন করা, মজুদদারি কঠোরভাবে দমন করা। খাদ্যে ভেজাল মেশানো, রং ব্যবহার ইত্যাদি কঠোরভাবে দমন করা। ‘খাদ্য নিরাপত্তা আইন’ কার্যকর করা। এই আইনে সবার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা। ‘ভোক্তা অধিকার আইন’ কার্যকর করা। 

৯) সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-দুর্বৃত্তায়ন-মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
ক. সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রচার এবং মতাদর্শিক লড়াইকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা, জনগণকে সচেতন করা। এসব অপশক্তির আর্থিক উৎস চিহ্নিত করে তাকে ধ্বংস করা।
খ. সব বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার, জঙ্গি অপরাধী চক্রের ঘাঁটি ও নেটওয়ার্ক নির্মূল, মাফিয়া-গডফাদারদের দমন এবং অপরাধী চক্রের দেশি-বিদেশি অর্থ ও শক্তির উৎসসমূহ উৎপাটনে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করা। ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা মাফিয়া-গডফাদারদের ও তাদের শক্তির উৎসকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা।
গ. চোরাচালানি, কালোবাজারি, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মাদক-ব্যবসায়ী, পেশাদার অপরাধী-খুনিসহ অপরাধী চক্রকে কঠোরভাবে দমন করা। 
ঘ. সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োজিত করা। এসব অপশক্তি এবং এদের অপতৎপরতা মোকাবিলায় জনগণের সক্রিয় ভূমিকা সংগঠিত করে তাকে একটি সর্বাত্মক জাতীয় অভিযান রূপে গড়ে তোলা। 

১০) কৃষি, কৃষক, গ্রামীণ মজুরের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়ন
ক. গ্রাম থেকে ঢালাওভাবে উদ্বৃত্ত উঠিয়ে আনার মুক্তবাজার অর্থনীতি নির্দেশিত নীতি পরিবর্তন করে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সেই প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন উদ্বৃত্তের সিংহভাগ বিনিয়োগ করা।
খ. খোদ কৃষক ও গ্রামের মেহনতি মানুষের স্বার্থে আমূল ভূমি সংস্কার, কৃষি সংস্কার ও গ্রামজীবনের মৌলিক পুনর্গঠন করা। খাস জমির সব অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমির বণ্টনসহ খাস খতিয়ানের খাল, বিল, জলাভূমি ইত্যাদি বন্দোবস্ত প্রদান নিশ্চিত করা। 
গ. বীজ, সার, ঋণ, কৃষি উপকরণ, প্রযুক্তি ইত্যাদি খোদ কৃষকের জন্য সহজলভ্য করা। ক্ষতিকর হাইব্রিড বীজ আমদানি নিষিদ্ধ করা। শস্যবীমা চালু করা। বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে কর্পোরেট ফার্মিং করার সুযোগ বন্ধ করা। 
ঘ. কৃষিপণ্যের উৎসাহমূলক ও লাভজনক মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র ও কৃষিপণ্য বিপণন সমবায় স্থাপন করা। জাতীয় স্বার্থে কৃষিখাতে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সাবসিডি প্রদান করা এবং খোদ কৃষক কর্তৃক তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। 
ঙ. সরকারি প্রণোদনায় কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা।
চ. ক্ষেতমজুরসহ গ্রামীণ মজুরদের জন্য সারা বছর কাজের ব্যবস্থা করা। ‘কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা স্কিম’ চালু করা। প্রজেক্টের কাজে দুর্নীতি, গম চুরি দমন করা। ক্ষেতমজুরদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিত করা। 
ছ. হাওরের জলমহাল ও ভাসান পানিতে প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করা। দেশের জলাভূমিসমূহের ব্যবস্থাপনা ও আহরণস্বত্ব দরিদ্র ও প্রান্তিক জেলেদের সমবায়ের হাতে দেয়া। 
জ. খাইখালাসি ধরনের আইন করে এনজিওঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করা। 
ঝ. আবাদি জমি সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১১ দেশীয় শিল্পের বিকাশ, শ্রমিক ও কর্মচারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়ন
ক. বন্ধ কল-কারখানা চালু করা। ব্যাংক-বীমা, টিএন্ডটি, বিদ্যুৎসহ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর বন্ধ করা। ইতিমধ্যে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরিত প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ জরিপের ভিত্তিতে প্রয়োজনে পুনরায় অধিগ্রহণ করা। পাট শিল্পকে রক্ষার জন্য কার্যকর বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 
গ. গার্মেন্টস্ শিল্পে ও অন্যান্য কল-কারখানায় দুর্ঘটনা রোধ, শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান, স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত, ‘ফ্যাক্টরি আইন’ পূর্ণভাবে কার্যকর করা। 
ঘ. ১৬ হাজার টাকা জাতীয় নিম্নতম মজুরি নির্ধারণসহ মজুরি কমিশনের সুপারিশসমূহ পুনর্বিন্যস্ত করে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। জীবনযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মিল রেখে মজুরি বৃদ্ধির ব্যবস্থা চালু করা এবং মজুরি কাঠামো প্রতি ২ বছর অন্তর পুনর্বিন্যাস করা ।
ঙ. সব ধরনের বেতন ও মজুরি বৈষম্য দূর করা। শ্রমিকদের জন্য সুলভ মূল্যে স্থায়ী রেশনিংয়ের ব্যবস্থা এবং বসবাসের জন্য ‘কলোনি’ নির্মাণ করা। 
চ. ইপিজেডসহ সর্বত্র আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিক, কর্মচারী, ক্ষেতমজুরসহ শ্রমজীবী জনগণের অবাধ পূর্ণ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করা। 
ছ. বর্তমানের অগণতান্ত্রিক ‘শ্রম আইন’ বাতিল করে শ্রমিকদের অনুকূলে যুগোপযোগী নয়া ‘শ্রম আইন’ প্রণয়ন করা। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, পরিপূর্ণ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার ও ধর্মঘটের অধিকার নিশ্চিত করা। আদালতে সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো শ্রমিককে বরখাস্ত নিষিদ্ধ করা।
জ. ট্রেড ইউনিয়নসমূহের ওপর মাফিয়া গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, মাস্তানি ও আমলাতান্ত্রিকতা দূর করে সুস্থ ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করা।

১২) শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন 
ক. ‘সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন, একই ধারার গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। পর্যায়ক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন সাধারণ শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা এবং তার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রায়োগিক শিক্ষা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সার্বজনীন করা। নিরক্ষরতা দূর করার জন্য একটি ৫ বছরের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যাপক জাতীয় অভিযান পরিচালনাসহ ব্যাপক গণশিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা। 
খ. ৩ বছরের মধ্যে প্রতি ২ বর্গকিলোমিটারে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৮ বছরের মধ্যে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। প্রাথমিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও গণশিক্ষা কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিয়ে একইসঙ্গে উচ্চশিক্ষার যথাযথ প্রসার ও উন্নতি সাধন করা। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও শিক্ষাঋণ প্রকল্প চালু করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করা। 
গ. বিশ্বব্যাংক কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের নীতির ভিত্তিতে গৃহীত কুখ্যাত ‘কৌশলপত্র’ বাতিল করা।
ঘ পর্যায়ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অর্থে জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নেয়া। ইউনেস্কো’র সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে জাতীয় আয়ের ৮% বরাদ্দ দেয়া।
ঙ. সব জাতিসত্তার জন্য প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা। 
চ. শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা, পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা ও তাঁদের অন্যান্য ন্যায্য দাবিসমূহ পূরণ করা। শিক্ষকদের পেশাগত কাজে দায়বদ্ধতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ন্যূনতম ১ ঃ ২৫ নিশ্চিত করা।
ছ. পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক উপাদান দূরীভূত করে জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ, অন্যায়-অবিচার-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রেরণা, মানবতাবোধ ও প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণা জাগরিত ও প্রসারিত করার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।
জ. পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার বর্তমান ব্যবস্থা বাতিল করা।
ঝ. সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতির জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা। সব পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস রোধকল্পে কঠোর আইন প্রণয়ন করা। 
ঞ. সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৩-এর অধ্যাদেশের আলোকে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। ছাত্রসংসদ নির্বাচন, শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর মনিটরিং, অভিন্ন টিউশন ফি চালু করা। 

১৩) স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসার মানোন্নয়ন
ক. সব নাগরিকের জন্য সুষম ও অভিন্ন গণমুখী চিকিৎসা নীতি, স্বাস্থ্য নীতি ও ওষুধ নীতি চালু করা। পর্যায়ক্রমে সবাইকে সরকারি স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নিয়ে আসা।
খ. প্রতিটি ইউনিয়নে মাতৃসদন, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন্দ্র ও গণস্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের সুবিধাদিসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্য-পরিচর্যাভিত্তিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা। হাসপাতালগুলোতে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রসারিত করা এবং সেখানে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জন্য বিনামূল্যে অথবা সুলভে চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি করা। 
গ. দেশের সব মানুষের জন্য আর্সেনিক ও জীবাণুমুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ, স্যানিটেশন, রোগ-প্রতিষেধক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা।
ঘ. বিভিন্ন দেশজ চিকিৎসা পদ্ধতির আধুনিকায়নের জন্য গুরুত্ব আরোপ করা। হোমিওপ্যাথি, বায়োক্যামি, আয়ুর্বেদীয়, হেকিমী ও অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।

১৪) যুবসমাজের তারুণ্য-সম্পদকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো
ক. ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট-এর সুবিধা নিতে, অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম তরুণদের কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উদ্যোগ নেয়া ও কর্মক্ষম বেকার যুবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। দেশের সামগ্রিক পুনর্গঠনে যুবসমাজের সৃষ্টিশীল প্রতিভা ও শক্তিকে কাজে লাগাতে উদ্যোগ নেয়া।
খ. যুবসমাজকে বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা, হতাশা থেকে মুক্ত করতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা, সন্ত্রাস, নৈতিকতাহীনতার গ্রাস থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করা। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। 
গ. কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে সংঘটিত কিশোর বিদ্রোহে উত্থাপিত যুবসমাজের ন্যায্য দাবিসমূহের বাস্তবায়ন করা। 

১৫) নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা
ক. নারীসমাজের ওপর পরিচালিত নানা অন্যায়-অত্যাচার ও বৈষম্য দূর করে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলসহ সর্বক্ষেত্রে নারীদের সমান অংশগ্রহণ, সমমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘মানবাধিকার সনদ’, ১৯৭৯ সালে ঘোষিত নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ তথা ‘সিডও সনদ’ (কোনো রকম সংরক্ষণ ছাড়াই), ১৯৯৩ সালে ঘোষিত ‘ভিয়েনা সম্মেলন’ এবং ১৯৯৫ সালে বিশ্ব নারী সম্মেলনে ঘোষিত ‘বেইজিং কর্মসূচি’ পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা। 
খ. বিদ্যমান ‘পারিবারিক আইন’ ও ‘উত্তরাধিকার আইনে’র ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বিরাজ করছে, তা দূর করা এবং ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’ চালু করা। নারী নির্যাতন দমন আইন আরও যুগোপযোগী করা।
গ. কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা। কর্মজীবী নারীদের জন্য ন্যূনতম ৬ মাস সবেতন প্রসূতিকালীন ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা করা। প্রাথমিক প্রজননস্বাস্থ্য-শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
ঘ. রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বসহ রাষ্ট্র-প্রশাসন-সামাজিক সংস্থার সর্বত্র নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সেই লক্ষ্যে সহায়ক কার্যক্রম গ্রহণ করা। সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে এক-তৃতীয়াংশ করা এবং প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। জেন্ডার বিষয়ক সংসদীয় কমিশন গঠন করা। মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া।
ঙ. নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফতোয়াকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে ২০০১ সালে হাইকোর্ট-প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়কে কার্যকর করা। 
চ. পরিবারে ও গৃহস্থালি কাজে নারীর শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। নারী ও পুরুষের মধ্যে কাজ ও মজুরির ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা করা। কথিত যৌনকর্মীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা। 

১৬) শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ-দুঃস্থ নাগরিকবৃন্দের অধিকার নিশ্চিত করা
ক. শিশুদের সৃষ্টিশীল বিনোদনের জন্য উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ ও কাঠামো গড়ে তোলা। শহরের পার্ক, খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার করে সংরক্ষণ করা। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সব এলাকায় যেন শিশুদের খেলার মাঠ থাকে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া। গ্রামাঞ্চলসহ সারাদেশে শিশুদের জন্য বিনোদন, খেলাধূলা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যার কমিউনিটিভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা। শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। শিশু-নির্যাতন প্রতিরোধে স্বাধীন কমিশন গঠন করা। ‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ’ বাস্তবায়ন করা। শিশু-কিশোর সংগঠন বিকাশে নানামুখী সহায়তা প্রদান করা। 
খ. দেশে বয়স্ক নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের জন্য বিশেষ সুবিধাসমূহ প্রসারিত ও বৃদ্ধি করা। গ্রাম ও শহরের অসহায় বৃদ্ধ নাগরিকদের জন্য পেনশন, বয়স্ক ভাতা, আবাসন কেন্দ্র, সেনিটোরিয়াম সুবিধা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। পথশিশু ও অভিভাবকহীন দুঃস্থ মানুষের জন্য রাত্রিকালীন নিবাস স্থাপনসহ আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও জীবন ধারণের সুযোগ করে দেয়ার সুবিধার্থে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা করা। 

১৭) ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য রোধ এবং তাঁদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা
ক. সব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সমান মর্যাদা এবং তাঁদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর উৎপীড়ন, বৈষম্য, হয়রানি বন্ধ করা। এ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু (অধিকার রক্ষা) কমিশন গঠন করা।
খ. কুখ্যাত ‘শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইন’ বাতিল করা। সম্পত্তির ওপর অংশীদারদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং এই আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করে বঞ্চিতদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়া।
গ. সমাজের সর্বক্ষেত্র থেকে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা।

১৮) বিভিন্ন জাতিসত্তা, আদিবাসী সমাজ ও দলিতদের যথাযথ স্বীকৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করা
ক. আদিবাসী হিসেবে বিভিন্ন জাতিসত্তার স্বকীয়তার পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর প্রদান এবং সেই অনুসারে দৃঢ় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
খ. বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, আইন, প্রথা এবং জ্ঞান ব্যবস্থার বিষয়কে আইনের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও বিকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাঁদের মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা। সব জাতিসত্তার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বাংলা ভাষার পাশাপাশি মাতৃভাষা শিক্ষা দেয়ার এবং সাংস্কৃতিক ও কৃষ্টিগত ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আদিবাসীদের ওপর হত্যা, অত্যাচার, উৎপীড়নের ঘটনার বিচার করা।
গ. ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য চুক্তি’র পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য গঠিত ‘ভূমি কমিশন’ সঠিকভাবে কার্যকর করার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জমি ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা। 
ঘ. সমতল ভূমির সাঁওতাল, গারো, হাজং, ওঁরাওসহ সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে একটি ‘ভূমি কমিশন’ গঠন করা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার খাস জমি বণ্টনে তাঁদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া। এ বিষয়ে ১৯৫০ সালের ভূমিস্বত্ব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
ঙ. দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান সব বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা দূর করা। অস্পৃশ্যতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করা। নবগঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য একটা বিশেষ সেল গঠন করা।

১৯) শহরের বস্তিবাসী, হকার ও নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন
ক. উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ করা। দরিদ্র নিম্নবিত্তদের জন্য ‘গৃহনির্মাণ ঋণ প্রকল্প’ চালু করা। বস্তিবাসীর জন্য পৌরজীবনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। শহরের খাস জমি উদ্ধার করে সেখানে সরকারিভাবে কলোনি, ডরমিটরি ইত্যাদি নির্মাণ করে তা বস্তিবাসীসহ গরিব শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বসবাসের জন্য বরাদ্দ দেয়া। 
খ. বাস্তুহীন ও নিম্নবিত্ত দরিদ্র সব পরিবারের জন্য ৩ বছরের মধ্যে ন্যূনতম বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।
গ. শহরগুলোতে যানজট, জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য স্বল্পমেয়াদী জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
ঘ. বাড়িভাড়া আইন কার্যকর করা। শহুরে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ রক্ষা করা।
ঙ. উপযুক্ত ও কার্যকর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে ফুটপাত থেকে নির্বিচারে হকার উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং উপযুক্ত ‘ভেন্ডর আইন’ প্রণয়ন করা।

২০) প্রতিবন্ধীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি ও অধিকার রক্ষা
ক. ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী নীতিমালা’ বাস্তবায়ন এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে শারীরিক, শ্রবণ, বাক্, দৃষ্টি ও লিঙ্গ প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। তাঁদের ‘ভিন্নভাবে প্রকাশিত সক্ষমতা’কে মূল্যায়ন ও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা। 
খ. প্রতিবন্ধীদের সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের
 জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ কনভেনশনে গৃহীত প্রতিবন্ধী জনগণের অধিকার বিষয়ক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা।

২১) তথ্য-প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমকে সার্বজনীন করা
ক. বাংলাদেশে তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, সেই সম্ভাবনার সদ্ব্যবহার করতে তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা। তথ্য-প্রযুক্তিগত সুবিধা সবাই যেন সমানভাবে পায়, তা নিশ্চিত করা। অভিন্ন কলরেট ও ইন্টারনেট মূল্য নির্ধারণ করা। ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ করা। ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়াইফাই জোন তৈরি করা। 
খ. গ্রাম-গ্রামান্তরে নিম্নবিত্ত জনগণের মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তি সুবিধা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা। 
গ. নতুন প্রজন্মের মধ্যে সস্তায় কম্পিউটার সরবরাহের মাধ্যমে কম্পিউটার স্বাক্ষরতা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটালাইজেশনকে আরও জনসম্পৃক্ত করা। 
ঘ. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার প্রসারিত করতে ‘ই-গভরনেন্স’ চালু করা। 
ঙ. সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ও অন্যান্য সাইবার-মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিধান করা। সাইবার ক্রাইম বন্ধে ‘বিশেষজ্ঞ সেল’ গঠন করা। 

২২) প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষা
ক. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে ধরিত্রী ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার বিশ্বব্যাপী সংগ্রামকে অগ্রসর করা।
খ. পানি, মাটি ও বায়ু দূষণের সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নদী-খাল-বিল-লেক-জলাধার জবরদখলকারী, বন উজাড়কারী, বন দখলকারী, পাহাড় দখল ও পাহাড় কাটার সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, বন বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও পরিবেশ ধ্বংসকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ‘পরিবেশ আদালত’ গঠন করা।
গ. বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনসহ বনাঞ্চল সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবন এলাকায় শিল্প-কারখানা নির্মাণ বন্ধ করা, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা। 
ঘ. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন গ্রাহক ৩ উপাদান-মাটি, গাছ ও পানির সর্বোত্তম সংরক্ষণ করা। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য জনগণের মধ্যে সামগ্রিক পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। 
ঙ. বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও কর্ণফুলীসহ দেশের সব নদ-নদী এবং জলাধারের পাড় ও মধ্য থেকে অবৈধ স্থাপনাসহ অবৈধ দখল অবিলম্বে উচ্ছেদ করা। শুকিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু নদী পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। 

২৩) জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও বিকল্প জ্বালানি নীতির বাস্তবায়ন
ক. জাতীয় সম্পদের ওপর শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করা। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানিনীতির অধীনে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। স্বনির্ভর প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বনির্ভরতা অর্জন, জাতীয় স্বার্থ, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবেশ ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করা। নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানিসম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে জ্বালানিনীতি প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ করা। টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথনকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
খ. জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত দায়মুক্তি আইন বাতিল করা। ‘খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ’ করার লক্ষ্যে আইন পাশ করা। দায়মুক্তি আইন ব্যবহার করে সম্পাদিত সব চুক্তি বাতিল করা। 
গ. অবিলম্বে জরুরিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ বছরের মধ্যে তা কমপক্ষে ৩৩% বৃদ্ধির জন্য এবং ১০ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া। 
ঘ. ৫ বছরের মধ্যে দেশের সর্বত্র গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। 

২৪) পানি উন্নয়ন ও বন্যা সমস্যার প্রতিকার
ক. আন্তঃরাষ্ট্রীয় নদীর পানি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার স্বার্থে ‘জাতিসংঘ পানি প্রবাহ আইন ১৯৯৭’-এ অনুস্বাক্ষর করা।
খ যথাযথ পানি-ব্যবস্থাপনা ও বন্যা-সমস্যা সমাধানের জন্য জাতীয় ভৌগলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ও উপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। এজন্য জাতীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণে সচেষ্ট হওয়া। প্রতিবেশী দেশ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা।
গ. একটি সামগ্রিক পানিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা এবং তার আওতায় সেচ-ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা। 

২৫) দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন
ক. দুর্যোগ-পূর্ব আধুনিক সতর্কতা-ব্যবস্থা স্থাপন করা। প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা। 
খ. দুর্যোগ-পরবর্তী নিরাপদ খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্থানিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। 
গ. ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি ও বিশেষায়িত উদ্ধারকর্মী দল গঠন এবং উদ্ধার-সরঞ্জামের আধুনিকায়ণ করা।

২৬) সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, যোগাযোগ-ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, যানজট রোধ
ক. নৌপথ, রেলপথ, রাজপথ ও আকাশপথসহ দেশের যোগাযোগ-ব্যবস্থার উন্নয়নে জাতীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা জাতীয় স্বার্থে কার্যকর করা। 
খ. নৌপথ ও রেলপথের যোগাযোগ-ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও বিকাশে অগ্রাধিকার দেয়া। পরিকল্পিতভাবে সড়ক যোগাযোগ-ব্যবস্থা গ্রামাঞ্চলে প্রসারিত করা।
গ. পরিবেশ সহায়ক, সহজলভ্য, পথচারী-বান্ধব বিকল্প গণপরিবহণ-ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত করা। 
ঘ. দুর্ঘটনার জন্য দায়ী পরিবহণমালিক ও সড়ক নির্মাতা প্রমুখের শাস্তির বিধান রেখে সড়ক দুর্ঘটনা আইনের সংস্কার। পরিবহণ ক্ষেত্রে মাফিয়াতন্ত্রের উচ্ছেদ করা। চাঁদাবাজি বন্ধ করা। 

২৭) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
ক. জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
খ. সব মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির দ্বারা দেশের বিপুল জনশক্তির সৃজন ক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে জাতীয় উন্নয়নের দিগন্ত প্রসারিত করা।
গ. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। ছোট পরিবার গঠনের বিষয়টিকে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষায় পরিণত করা। জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাদির ব্যবহার জনপ্রিয় ও সহজলভ্য করা। এসব প্রয়াসের মাধ্যমে ৫ বছরের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা।

২৮) সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো
ক. জনগণের সুষ্ঠু, মানবিক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারা অগ্রসর করা এবং জীবনবিমুখ, ভোগবাদী, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ অপসংস্কৃতির প্রসার রোধ করা। সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল, কুসংস্কারমূলক ধ্যান-ধারণা দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। বিজ্ঞানমনষ্কতা, বিজ্ঞান চর্চা, বুদ্ধিবৃত্তি প্রভৃতির বিকাশ ঘটানো। জনগণের সব সৃজনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করা, পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা ও উপযুক্তভাবে কাজে লাগানো। 
খ. এ দেশের শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের সংস্কৃতিকে মূল ধারায় নিয়ে আসা। লোকজ সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রমকে দলীয়করণমুক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পশ্চাদপদতা দূর করার লক্ষ্যে উদার, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক সংস্কৃতির ধারাকে বিকশিত করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা। 
গ. সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা। বাংলা সাহিত্যকে বিশে^র দরবারে পরিচিত করতে এ দেশের সাহিত্যকর্মকে অনুবাদ করার লক্ষ্যে বিশেষ অনুবাদ সেল গঠন। 
ঘ. সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কর্পোরেট আগ্রাসন বন্ধ করা। চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে অর্থ বরাদ্দ করা ও নতুন নির্মাতাদের উৎসাহ প্রদান এবং সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রকে অগ্রসর করার স্বার্থে সরকারি অনুদান বৃদ্ধি করা। 
ঙ. আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ, সর্বত্র মুক্তমঞ্চ নির্মাণ ও মঞ্চনাটকের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করা। 

২৯) ক্রীড়া, শরীরচর্চা ও বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা
ক. বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত খেলাগুলোর পুনরুজ্জীবন। শহরে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা। জেলা পর্যায়ের স্টেডিয়ামগুলোর মানোন্নয়ন করা। উপজেলা পর্যায়ে নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদকজয়ের লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা।
খ. স্কুল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং খেলোয়াড়দের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে নিয়ে আসা।
গ. সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে জিমনেসিয়াম এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে শরীরচর্চা কেন্দ্র স্থাপন করা। 
ঘ. পর্যটনকে উৎসাহিত করতে পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আধুনিক, পরিবেশসম্মত, নান্দনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা। উপজেলা পর্যায়ে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা। 

৩০) স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা 
ক. স্বাধীন ও সক্রিয় জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করা। পারস্পরিক স্বার্থ, সমমর্যাদা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
খ. আন্তর্জাতিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের গণতন্ত্রায়ন, জাতিসংঘ ও তার বিভিন্ন সংস্থার গণতন্ত্রায়ন এবং প্রতিটি জাতির বিকাশের নিজস্ব পথ বাছাইয়ের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় প্রয়াস চালানো।
গ. স্থায়ী বিশ্বশান্তি ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য দৃঢ় ও সক্রিয় প্রচেষ্টা চালানো।
ঘ. সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবাদ, জায়নবাদ, নব্য নাৎসিবাদ প্রভৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা এবং এসবের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাতি ও আন্দোলনসমূহের সঙ্গে ঐক্য ও সংহতি জোরদার করা।
ঙ. তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ও জোরদার করা।
চ. ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি এসব দেশের সঙ্গে ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো-যথা ভারতের সঙ্গে সব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য; পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাপ্য সম্পদ আদায় ও আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত পাঠানো ইত্যাদি সমস্যার জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে সমাধান করা। উপমহাদেশকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করা এবং এ অঞ্চলে আত্মঘাতী অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ করা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করা। 
ছ. ‘সার্ক’ সংস্থার কার্যক্রমকে বহুমুখী ধারায় প্রসারিত করা এবং তার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার ভিত্তি প্রসারিত ও গভীরতর করা। ‘সার্ক’ দেশসমূহের জনগণ ও গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল শক্তি ও আন্দোলনসমূহের মধ্যে সংহতি ও সহযোগিতা গভীরতর করা।

ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ বাস্তবায়নে ৩০ দফা কর্মসূচির সমর্থনে এগিয়ে আসুন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিপিবির মনোনীত প্রার্থীদেরকে ‘কাস্তে’ মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন। জনগণের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত